অনলাইন দৈনিক না আইডি কার্ড বিক্রির কারখানা!

184
Spread the love

12011মোঃ নাজমুল হুদা নাসিম : দেশে অনলাইন দৈনিকের সংখ্যা কত এমন প্রশ্ন করলে কেউ তার সঠিক উত্তর দিতে পারবেন না। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও পারবেনা; না পারারই কথা। কারণ সরকারের নজরদারী না থাকায় শুধু বগুড়া নয় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মত শত শত অনলাইন পত্রিকা চালু হয়েছে। রঙ-বেরঙের বাহারী বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশের সর্বত্র প্রতিনিধি চাওয়া হচ্ছে। অনেকে ‘সাংবাদিক’ পরিচয় দেবার সুবিধার্থে এসব দৈনিকে কাজ (!) করছেন। কিছুদিন কাজ করার পর দৈনিকের কর্ণধাররা ওইসব সাংবাদিককে একটা ‘আইডি’ ধরিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু কোন নিয়োগপত্র নেই। তাই বেতন দেবার কোন প্রশ্নই উঠেনা। অনলাইন সাংবাদিকদের অনেকে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে প্যান্টের হুকের সাথে আইডি কার্ডটি ঝুলিয়ে রাখছেন। মোটরবাইকে বড় অক্ষরে ‘প্রেস’ লিখছেন। ওই সাংবাদিক দুই লাইন লেখার ক্ষমতা রাখেন কিনা তা দেখার প্রয়োজন নেই। জনগণ জানছেন উনি সাংবাদিক। ওই কার্ড ঝুলিয়ে সাংবাদিক বাবু পেশাদার সাংবাদিকদের কাতারে চলাফেরা করছেন। তাদের আচরণে পেশাদাররা বিব্রতবোধ করছেন। ইদানিং অনলাইন সাংবাদিকতা এতই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, অনেকে প্রতিষ্ঠিত পেশা ফেলে এসব দৈনিকের কার্ডধারী হচ্ছেন। এতে কি ফায়দা তা তিনি ও সাধারণ অনেক মানুষ জানেন।আমি একজন পেশাদার সাংবাদিক। একটি প্রতিষ্ঠিত জাতীয় দৈনিকে বগুড়া ব্যুরো প্রধান হিসেবে তিনটি জেলার দায়িত্বে আছি। অন্য কোন দৈনিকে কাজ করার সুযোগ নেই। এরপরও অনেক অনলাইনের সম্পাদক, প্রকাশক ও মালিক বন্ধু রিপোর্ট দিতে অনুরোধ করেন। আমার দৈনিকে সবখবর প্রকাশের স্থান বা সুযোগ নেই। তাই বন্ধুদের অনুরোধে কয়েকটি অনলাইন দৈনিকে নিয়মিত খবর পাঠিয়ে থাকি। ওইসব অনলাইন দৈনিকের মালিক বা সম্পাদকরা বলেন, ‘ভাই আপনি সিনিয়র সাংবাদিক, আপনাকে বেতন-ভাতা দেবার ক্ষমতা আমাদের নেই। শুধু আপনার সহযোগিতা চাই। তারপরও আপনাকে সম্মান করবো’। কিন্তু কখনও তারা সম্মান দেখাননি। কোন কোন বেতন খেলাপী অনলাইন দৈনিকের মালিক বলে থাকেন ‘অনলাইন সাংবাদিকতা স্মার্ট পেশা’।
আমেরিকা থেকে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিকের ‘বিশেষ প্রতিনিধি’ ছিলাম। বৃটেন থেকে প্রকাশিত ইউকেবিডি নিউজ নামে একটি দৈনিকে দীর্ঘদিন বগুড়া প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু বিনিময়ে একটি টাকাও দেয়া হয়নি। কিছুদিন আগে রাজশাহীর এক ফেসবুক বন্ধুর অনুরোধে একটি অনলাইন দৈনিকে রিপোর্ট দেয়া শুরু করলাম। তারা কিছু খরচ দেবার ইঙ্গিতও করেছিলেন। পরবর্তীতে ওই অনলাইন দৈনিকের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তি আমাকে ই-মেইলে জানালেন নিয়োগ নয় শুধু একটা আইডি কার্ড দিবেন। এর জন্য খরচ দিতে হবে। ঘৃনায় সেখানে রিপোর্ট দেয়া বন্ধ করলাম। এমন অনেক অনলাইন দৈনিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। এরপরও অনুরোধে ঢেঁকি গেলা। এখনও অন্তত ১৫টি অনলাইন দৈনিকে আমার রিপোর্ট প্রকাশ হয়। এদের মধ্যে ঢাকার একটি অনলাইন দৈনিকের মালিক আমাকে মোবাইলে ফোন দিলেন। তিনি বললেন, ভাই আমরা প্রতিনিধিদের আইডি কার্ড দেয়া শুরু করেছি। আপনারটা কিভাবে পাঠাবো? আমি কিছু বলার আগেই তিনি বললেন, ঢাকায় আসেন; মিষ্টি খাওয়াতে হবে। তার এ কথা শুনে আমার মাথা গরম হয়ে গেল। উত্তরে বললাম আমি একটা প্রতিষ্ঠিত দৈনিকের ওয়েজবোর্ডে বেতন পাওয়া স্টাফ রিপোর্টার। আমার আইডি কার্ডের কোন প্রয়োজন নেই। আমার কথায় তিনি ফোন রেখেদিলেন। আমার কাছে তার ব্যবসা হলোনা।শুধু অনলাইন দৈনিককে দোষারোপ করছি কেন? প্রিন্ট মিডিয়াতেও তো এমনভাবে কার্ড বিক্রির খেলা চলছে। অনেকদিন বন্ধ থাকা বগুড়ার একটি ভালমানের দৈনিক সম্প্রতি আবার চালু হয়েছে। মালিক-সম্পাদক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অন্য একজনকে দিয়েছেন। সিনিয়র ওই সাংবাদিক ইতিমধ্যে আইডি কার্ড বিক্রি শুরু করেছেন। কয়েকদিন আগে শেরপুর থেকে এক অ্যাডভোকেট সাহেব চকচকে প্রিন্টের একটি অখ্যাত দৈনিকের কার্ড নিতে বগুড়া শহরে আসেন। তার সাথে থাকা ব্যক্তি আমার পরিচিত। তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন ভাই চকচকে প্রিন্টের ওই অনিয়মিত দৈনিকের আইডি কার্ডের দাম ৩ হাজার দাবি করছেন। নেয়া যায় কিনা? আমি কোন উত্তর দিতে পারলাম না। আমি কৌতুহলবশত ওই অ্যাডভোকেট সাহেবকে প্রশ্ন করলাম কখনও সাংবাদিকতা করেছেন। তিনি উত্তর দিতে পারলেন না। তিনি বললেন, আইডি কার্ড পেলে মানুষের সুখ-দুঃখ ও মানবাধিকার নিয়ে লিখবেন। পরে দেখলাম ওই উকিল সাহেব নতুন করে শুরু হওয়া দৈনিকের কার্ড কিনে নিয়ে গেলেন। এর কয়েকদিন পর আরও এক ব্যক্তিকে আইডি কার্ড কিনতে দেখলাম। আইডি কার্ড তৈরির সুবিধার্থে আমি আমার মোবাইল ফোনের ক্যামেরা দিয়ে তার ছবি তুলে দিলাম। সকালে অফিসে এসে প্রতিদিনের মত ফেসবুক খুলতেই শাজাহানপুরের এক ছোট ভাইয়ের ম্যাসেজ পেলাম। সে ওই দৈনিকের শাজাহানপুর উপজেলা প্রতিনিধি হবার গৌরব অর্জন করেছে। এমন ম্যাসেজটি আমাকে ট্যাগ করা হয়েছে। অনেকে এ নিয়োগ পাবার জন্য তাকে কনগ্রেচ্যুলেশনও জানিয়েছেন। আমি শুধু ওই ছোট ভাইকে প্রশ্ন করলাম কত টাকা লাগলো? উত্তরে সে শুধু হাসলো। এমন কার্ড বিক্রির খেলা শুধু বগুড়ায় নয়; খোদ রাজধানীসহ দেশের সর্বত্রই চলছে।আবার সব অনলাইন দৈনিকের মালিক বা সম্পাদক যে নিয়োগ ব্যবসা করছেন তা বলা ঠিক হবেনা। এখনও কয়েকটি অনলাইন দৈনিক মোটা অংকের বেতন দিয়ে সাংবাদিক রেখেছেন। অনেক সাংবাদিক ওয়েজবোর্ডেও বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। তবে কার্ড ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় মানুষের অনলাইন দৈনিকের উপর আস্থা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সরকারি নজরদারী না থাকা ও অবাধ তথ্য প্রবাহের সুযোগে ব্যাঙের ছাতার মত অনলাইন দৈনিক গড়ে উঠছে। চলছে আইডি কার্ড বিক্রির ব্যবসা। এসব দৈনিকের সাংবাদিক নামধারীদের অনেকে নিজে প্রতারিত হচ্ছেন; তিনি অন্যের সাথেও প্রতারণা করছেন। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অবিলম্বে অনলাইন দৈনিকের ব্যাপারে নীতিমালা করা উচিত। নয়তো দেশে সাংবাদিক আইডি কার্ড বিক্রির কারখানার সংখ্যা বেড়ে যাবে। অনেক কার্ডধারী হলুদ সাংবাদিকের জন্ম হবে। সাংবাকিতার মহৎ পেশার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে। জন্ম নিবে ঘৃনার।


Spread the love