অভিজিতের প্রকাশককে কুপিয়ে হত্যা আরও তিন লেখক-প্রকাশক আক্রান্ত : একজন আশঙ্কাজনক

83
Spread the love

01স্টাফ রিপোর্টার : শুদ্ধস্বরের তিন প্রকাশক ও লেখকের ওপর হামলার চার ঘণ্টা পর রাজধানীর শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে (৩৬) কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। অভিজিত রায়ের বইয়ের প্রকাশক ছিলেন দীপন। গতকাল শনিবার বিকেল পাঁচটার সময় নিজ অফিসে তাকে কুপিয়ে চলে যায় দুর্বৃত্তরা। পুলিশ তাকে আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সন্ধ্যা সাতটার সময় তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ তার লাশ ময়না তদন্তের জন্য জরুরী বিভাগের মর্গে রেখেছেন।নিহতের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. আবুল কাশেম জানান, গতকাল শনিবার বিকেল পাঁচটার সময় দীপন তার আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলার অফিসে বসে কাজ করছিল। ওই সময়ে কয়েকজন দুর্বৃত্ত তার মাথা মুখমন্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে কুপিয়ে ঘরের শার্টার বন্ধ করে চলে যায়। পরে মার্কেটের সেক্রেটারী বাহির থেকে রক্ত দেখে পুলিশকে সংবাদ দেয়। শাহবাগ থানার পুলিশ সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার সময় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডাঃ রিয়াজ মোর্শেদ তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এদিকে ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যার কোনো বিচার চান না তার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল কাশেম ফজলুল হক। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, যারা অভিজিৎকে হত্যা করেছে তারাই দীপনকে হত্যা করেছে। হত্যাকারীদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি এই হত্যাকান্ডের বিচার চাই না। কেননা বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক, সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক। বিচার চেয়ে কি হবে? একজনের ফাঁসি দিয়ে কি হবে? না দিলেই বা কি হবে? হয়তো নিয়ম অনুযায়ী আমাকে একটি মামলা করতে হবে। কিন্তু এর বিচার আমি চাই না। এর আগে জঙ্গিদের হামলায় নিহত মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞান মনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশনা সংস্থা শুদ্ধস্বর’র স্বত্বাধিকারী আহমেদুর রশীদ টুটুল দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হন। বইয়ের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে গতকাল শনিবার হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। তাদের ধারালো অস্ত্রের কোপে ও গুলিতে প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলসহ তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। বর্তমানে তাঁরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আহত অন্য দু’জন হলেন তারেক রহিম ও রণদীপম বসু। কতিপয় দুর্বৃত্ত বেলা আড়াইটার দিকে লালমাটিয়ার সি ব্লকে পাঁচতলা একটি ভবনের চারতলায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে ঢুকে এ হামলা চালায়। এ সময় তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে কার্যালয়ের বাইরে তালা লাগিয়ে চলে যায়। পরে খবর পেয়ে মোহাম্মদপুর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। অস্ত্রোপচারের পর ঢাকা মেডিকেলের ক্যাজুয়ালটি বিভাগের সার্জন কে এম রিয়াজ বিকেল ৫টার দিকে সাংবাদিকদের বলেন, টুটুল ও তারেকের অবস্থা ক্রিটিকাল। রণদীপম আশঙ্কামুক্ত। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে একটি সূত্র প্রাথমিকভাবে জানায়, তারেক রহিমের বুকের বাম দিকে গুলি লেগেছে। এ ছাড়া তাঁর মাথা ও হাতে ধারালো অস্ত্রের আঘাত করা হয়েছে। আহমেদুরের মাথা ও হাতে এবং রণদীপম বসুর হাতে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, দুপুর আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে এ হামলার ঘটনা ঘটে। মোহাম্মদপুর থানা-পুলিশ খবর পেয়ে ওই কার্যালয়ের তালা ভেঙে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল থেকে মোহাম্মদপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আল মামুন বলেন, আহত অবস্থায় আমি দু’জনকে নিয়ে এসেছি। তাঁদের হাতে ধারালো অস্ত্রের আঘাত আছে। এদিকে বিকেলে লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে যান সমকালের নির্বাহী সম্পাদক মোস্তাফিজ শফি। সেখান থেকে নেমে তিনি দাবি করেন, আড়াইটার পরপর প্রকাশক টুটুলের নম্বর থেকে তাঁর মোবাইলে একটি ফোন আসে। রাসেল নামে এক যুবক নিজেকে শুদ্ধস্বরের কর্মচারী পরিচয় দিয়ে বলেন, কয়েকজন লোক এসে আমাদের এখানকার তিনজনকে কুপিয়ে গুলি করে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে চলে গেছে। আমাদের রক্ষা করেন। একই সঙ্গে তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারের মোবাইলেও একই নম্বর থেকে আমাদের বাঁচান বলে এসএমএম আসে। মোস্তাফিজ শফি জানান, ওই ফোন পেয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বিপ্লবকে ফোন দেন। তিনি জানান, আমরা এ্যাকশন নিয়ে ফেলেছি। র‌্যাব-২ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজান বলেন, কার্যালয়ের দু’টি রুমে ভাঙচুর করা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় রক্ত পড়ে আছে। ঘটনাস্থলে গুলির একটি খোসা এবং একটি তাজা গুলি পাওয়া গেছে। অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলকে মারতেই হামলাকারীরা এসেছিল বলে তার কার্যালয়ে উপস্থিত একজন জানিয়েছেন। গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর লালমাটিয়ার সি ব্লকে টুটুলের প্রতিষ্ঠান শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে যখন হামলা হয়, তখন কয়েকজনের সঙ্গে এই তরুণও সেখানে ছিলেন। বেলা আড়াইটার দিকে ওই ভবনের চতুর্থ তলায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে হানা দেয় দুর্বৃত্ত দল। তারা কুপিয়ে আহত করার পর বাইরে তালা মেরে চলে যায়। পরে পুলিশ গিয়ে তালা ভেঙে ঢোকে। ভেতরে আটকা পড়া ওই তরুণ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা (হামলাকারী) ছিল পাঁচজন। তারা ঢুকেই বলেছিল, আমরা টুটুলকে মারতে এসেছি। পুলিশ গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় টুটুল, ব্লগার তারেক রহিম ও লেখক রণদীপম বসুকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। বিকেল সোয়া ৩টার দিকে রণদীপম বসু ফেসবুকে লেখেন, কুবাইছে (কুপিয়েছে), আমি টুটুল ভাই আর তারেক। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ওই তরুণ বলেন, তাকেসহ অন্যদের অস্ত্রের মুখে পাশের কক্ষে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। নক করা হলে দরজা খুলে দেওয়া হয়। একজন ঢুকে বলে যে সে বই নিতে এসেছে। তাকে ঢুকতে দিলে বলে, আমার এক ভাই আছে। এরপর দরজা খুললে তিনজন একসঙ্গে ঢোকে। এদের একজন স্বাস্থ্যবান। একজনের হালকা দাড়ি ছিল। যার হাতে পিস্তল ছিল, তার ১৬-১৭ বছর বয়স। প্রথমে যে ঢুকেছিল তার কাছে কালো ব্যাগ ছিল। সেখান থেকে চাপাতি বের করে। আমাদের অন্য ঘরে জিম্মি করে রাখে। পরে কুপিয়ে তালা লাগিয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় গুলির শব্দ শুনি। শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ের সামনে একটি টেইলার্সের দোকানের কর্মচারী বলেন, চিৎকার শুনে আমরা ওইদিকে খেয়াল করে দেখি একটি মোটরসাইকেলে করে তিনজন দ্রুত বের হয়ে যাচ্ছে। গত ফেব্র“য়ারিতে বইমেলার বাইরে প্রবাসী লেখক অভিজিৎকে কুপিয়ে হত্যার সঙ্গে জঙ্গিরা সংশ্লিষ্ট বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়ের ‘অবিশ্বাসের দর্শন’সহ কয়েকটি বই বের করেছে শুদ্ধস্বর। তাদের কার্যালয়ে হামলায় কারা জড়িত, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। গত ফেব্র“য়ারিতে অভিজিৎ নিহত হওয়ার পর ফেসবুকে হত্যার হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়ে টুটুল মোহাম্মদপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। এদিকে টুটুলসহ তিনজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানে ভিড় জমে। ইমরান এইচ সরকারের নেতৃত্বে গণজাগরণ মঞ্চ বিক্ষোভ মিছিলও করেছে। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ঘটনা কারা ঘটিয়েছে, এখনও চিহ্নিত করা যায়নি। তবে তিনজনের জড়িত থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আমরা ঘটনাস্থলে তদন্ত করে দেখছি। ঘটনাস্থল থেকে একটি তাজা গুলি ও খোসা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ফেব্র“য়ারিতে টুটুলের জিডির পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল-জানতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তা বিপ্লব বলেন, জিডি করেছিল কি-না, মনে নেই। তারা যখনই পুলিশের সাহায্য চেয়েছে, তা দেওয়া হয়েছে।

Spread the love