আজ ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি দিবস

171
Spread the love

image_2067_261278দিনাজপুর প্রতিনিধি : আজ ২৪ আগস্ট। ২০ বছর আগে ১৯৯৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরে কয়েকজন বিপথগামী পুলিশ সদস্য কর্তৃক ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিল কিশোরী ইয়াসমিন। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল দিনাজপুরের সর্বস্তরের জনতা। প্রতিবাদী জনতার উপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। নিহত হয়েছিল সামু, সিরাজ, কাদেরসহ ৭ জন ব্যক্তি। আহত হয় ৩ শতাধিক। তখন থেকেই দিনাজপুরসহ দেশব্যাপী দিবসটি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে নিহত ইয়াসমিনের মা শরিফা বেগম আজ তার গোলাপবাগ বাড়িতে কোরআন খানি ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে। মহিলা বহুমুখী শিক্ষাকেন্দ্র (এমবিএসকে) এ উপলক্ষে ইয়াসমিনের কবর জিয়ারত, র‌্যালি, পদযাত্রা, আলোচনা সভার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এমবিএসকের নির্বাহী প্রধান রাজিয়া হোসেন জানান, এমন সময় ইয়াসমিন ট্রাজেডি পালিত হতে যাচ্ছে যখন দেশব্যাপী শিশু হত্যা, নারী নির্যাতন, অপহরণ ক্রমাগত ভাবে শুরু হয়েছে। নরপশুদের বিচার হচ্ছে না। শিশু রাজন, রাকিব, রবিউল হত্যাকারী ও নারী ধর্ষণ, নির্যাতনকারীরা নিরাপদে আছে। আতংক ও আশংকায় রয়েছে শিশুদের অভিভাবক ও নারীরাও। এই দিনে ইয়াসমিন ট্র্যাজিডি ঘটনা স্মরণ করেই মহিলাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠতে হবে। এছাড়াও বিভিন্ন সংগঠন ইয়াসমিনের কবর জিয়ারত, দিনব্যাপী দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
এদিকে দীর্ঘ ২০ বছরে ইয়াসমিন, সামু, সিরাজ, কাদেরসহ নিহতদের পরিবারগুলো সরকারিভাবে তেমন সুযোগ সুবিধা পায়নি। নিহত সামু, সিরাজ, কাদেরের স্ত্রীদের তৎকালীন বিএনপি সরকার চাকরির প্রতিশ্রুতি দিলেও আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট। দীর্ঘ দিন পর মা’কে দেখার জন্য আকুল হয়ে ঢাকা থেকে দিনাজপুরে বাড়ি ফিরছিলো কিশোরী ইয়াসমিন। কিন্তু দিনাজপুরের কোচে না উঠতে পেরে সে পঞ্চগড়গামী একটি কোচে উঠায় কোচের লোকজন তাকে দশমাইল নামক স্থানে নামিয়ে দিয়ে সেখানকার চায়ের দোকানে জিম্মায় দেয়। নিরাপদ ও রক্ষক ভেবে ইয়াসমিনকে দিনাজপুর শহরে মায়ের কাছে পেঁৗছে দেয়ার জন্য কাক ডাকা ভোরে পুলিশের হাতে তুলে দেয় দশমাইলের লোকজন। কিন্তু রক্ষক হয়ে পুলিশ ভক্ষক সেজে পথিমধ্যে কিশোরী ইয়াসমিনকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করে হত্যা করে। পুলিশ ইয়াসমিনের লাশ দিনাজপুর শহরে থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে ব্র্যাক অফিসের পাশে রাস্তায় ফেলে চলে যায়।
পুলিশের এই পৈশাচিক ঘটনা জানাজানি হলে হাজার হাজার জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রতিবাদী নেতা বর্তমান জাতীয় সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপালের নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ মিছিল বের করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়। ১০ মাইল মোড়ে ব্যারিকেড দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। লাখো মানুষের সমাাবেশে মনোরঞ্জন শীল গোপাল ঘোষণা দেন দোষীদের গ্রেফতার করা না হলে সবকিছু অচল করে দেয়া হবে। পরের দিন রামনাগর মোড় থেকে জাগপার সভাপতি রকিব উদ্দীন চৌধুরী মুন্নার নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ জনতার একটি মিছিল বের হয় এবং বিক্ষোভে পুলিশ ফাঁড়িসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অগি্নসংযোগ করে। কিন্তু তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে একটি পত্রিকার সহায়তা নিয়ে উল্টো নিষ্পাপ কিশোরী ইয়াসমিনকে পতিতা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চালায়। এতে আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে প্রতিবাদী জনতা। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে দিনাজপুরের সর্বস্তরের মানুষ। বিক্ষুব্ধ জনতার উপর লাঠিচার্জ করে। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ২৬ আগস্ট রাতে বিক্ষুব্ধ জনতা কোতোয়ালি থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করতে থাকলে পুলিশ আবারও তাদের উপর লাঠিচার্জ করে। এ সময় হাজার হাজার জনতা কোতোয়ালি থানার সীমানা প্রাচীর ভেঙে ফেলে। ২৭ আগস্ট সাবেক সাংসদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক এম.আব্দুর রহিমের নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ জনতা একে একে রাজপথে নেমে এসে সকল প্রশাসনিক কর্মকর্তার বদলি এবং দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবিতে জনতার বিশাল মিছিল বের হলে মারমুখী পুলিশ শহরের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গুলি চালায়। ফলে সামু, কাদের ও সিরাজসহ নাম না জানা ৭ জন নিহত হয়। আহত হয় ৩ শতাধিক। এরপর আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কাস পার্টিসহ সকল রাজনৈতিক দল এক কাতারে আন্দোলন শুরু করে। পুলিশ মনোরঞ্জন শীল গোপাল, জাগপা নেতা রকিব উদ্দীন চৌধুরী মুন্নাসহ শত শত নিরীহ মানুষকে আসামি মামলা দায়ের করে। জাগপা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি মুকুল ও জাগপা শ্রমিক লীগের সভাপতি মোমিনূল ইসলামের পুত্র তুহিনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার ও মামলা করেও পুলিশ জনতার তোপের মুখে টিকে থাকতে পারেনি। পরবর্তীতে বিক্ষুব্ধ জনগণ শহরের ৪টি পুলিশ ফাঁড়ি, সরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রেসক্লাব, স্থানীয় ৫টি পত্রিকা অফিস আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎকালীন বিডিআরকে নামানো হয়। দীর্ঘদিন মামলা চলার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে ইয়াসমিন হত্যা মামলাটি দিনাজপুর থেকে স্থানান্তর করা হয় রংপুরে। রংপুর বিশেষ আদালতে ইয়াসমিন হত্যা মামলার স্বাক্ষ্য প্রমাণ শেষে দোষী প্রমাণিত ৩ পুলিশ সদস্যেকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।


Spread the love