আমার মায়ের স্বপ্ন এবং মৃত্যু

172
Spread the love

120ছৈয়দ আলম : আমাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল সাত জন। মা, বাবা আমি ও চার বোন। বলতে গেলে অনেক সুখের একটি সংসার। বোনগুলো ছিল অনেক পড়ুয়া এবং মেধাবী। বাবা মায়ের কথা ছাড়া একপাও নাড়াত না। পরিবারে একমাত্র মা ই ছিল যে কিনা মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু বেশী উদ্বিগ্ন ছিলেন। স্বপ্ন দেখতেন বোনগুলো একদিন বড় হয়ে পড়ালেখা করে উচ্চ শিক্ষায় আসীন হবে। পড়ালেখা করে অন্তত বিয়ের পরে হলেও জামাই ঘরে বরন-পোষন নিতে একটা সরকারী চাকরী বা প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা করবে। ঠিক সেই ভাবে ভাই-বোনদের লেখাপড়াও চলতেছিল। আমার বড় আপা সচরাচর বড় হতে লাগলো এবং একদিন মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করল এরপর মায়ের স্বপ্ন পুরনে আমার ছোট মামা মাওলানা মফিজুর রহমান মাদানীর সার্বিক তত্তাবধানে একদম বাড়ির পাশ্ববর্তী প্রতিষ্টান রংগীখালী মাদ্রাসায় আলিমে ভর্তি করে দিল। মাদ্রাসায় ভর্তি করার সময় মা থাকতেন বাড়িতে আর বাবা ছিলেন চাকরীতে কক্সবাজার জেলা পরিষদে। যেহেতু বাবা বাড়িতে থাকতেন না সেহেতু মা প্রত্যেক দিন আমাদের পড়ালেখা কেমন চলতেছে? ভাত খেয়েছি কিনা? প্রতিষ্টানে গিয়েছি কিনা? নামাজ পড়েছে কিনা? আরও অনেক কিছু যা কিনা সচরাচর একজন মা সবাইকে জিজ্ঞেস করত।
এভাবেই দিন অতিবাহিত হয়েছিল। একদিন মায়ের বড় মেয়ে দাখিল পাস করার পর আমি ও আমার মেঝ আপা একই প্রতিষ্টান থেকে দাখিল পাস করলাম। তখন আমি ছিলাম কক্সবাজারে। আইসিটিতে কম্পিউটার কোর্সে ভর্তি ও প্রচুর গান গাইতাম। রেজাল্ট যেদিন দিয়েছিল সেদিন প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি। মা রেজাল্ট শোনার পর আমাকে যেভাবেই হোক বাড়িতে যাওয়ার জন্য আকুতি মিনতি করছে। তখন আমি আছাদ কমপ্লেক্স এর মধুবন থেকে ৫ কেজি মিষ্টি নিয়ে পানির স্রোতের সাথে মিশিয়ে বাড়ির উদ্দ্যেশ্যে রওয়ানা দিলাম। তখনও কিন্তু কক্সবাজার চেইন্দা সড়ক পানির নিচে। তারপরেও আল্লাহর উপর ভরসা রেখে মায়ের অফুরন্ত দোয়া নিয়ে বাড়িতে পৌছলাম। মা যখন আমাকে দেখল বোন ও হায় আমার পুত বলে জড়িয়ে ধরে অশ্র“নয়নে কান্না করছে। ঠিক ৫ মিনিট পর আমার ছোট মামা বাড়িতে হাজির পরক্ষনে মা ও মামা কে বোনদের নিয়ে আমি তাদের মিষ্টি খাওয়ালাম। পরে আমাকে ও মেঝ আপাকে ছোট মামা রংগীখালী মাদ্রাসায় আলিমে ভর্তি করিয়ে দিল। এভাবেই মায়ের স্বপ্ন পূরন হতে চলছিল। ঠিক সেই সময় মায়ের একমাত্র আমি ছেলে। আমার ছোট দু-বোন সেতু ও শাম্মী তখন একই ক্লাসে ৮ম শ্রেনীতে পড়ত। একদিন মা আমাকে বলল অ পুত আমার পেটে একটা গোল করে অদৃশ্য টিউমারের মত দেখা দিচ্ছে। পরে বাবা যখন কক্সবাজারে চাকরিতে থাকত তখন একমাত্র ছেলে হিসেবে আমাকেই দেখাশুনা করতে হত। তখন মা,কে কক্সবাজার ডা: খোন্দকার আছাদুজ্জামান এর কাছে নিয়ে গেলাম। ডাক্টার মা,কে দেখে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা দিয়ে আমাকে একপাশে ডেকে বলল অপারেশন দিতে হবে তোমার মায়ের টিউমার হয়েছে। তখন আমি বাবার রুমে গিয়ে বললাম মায়ের অপারেশন করতে হবে। বাপ-পুত মিলে পরামর্শ করে দ্রুত অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নিলাম গেলাম দ্রুত ডাক্টারের কাছে। হয়ে গেল যাবতীয় চিকিৎসার কন্ট্রাকও। পরে ডাক্টারের পরামর্শ অনুযায়ী ভর্তি করালাম সী-সাইড হাসপাতালে। ঘড়ির কাটা তখন বিকাল ৫ টা বাবার অনুপস্থিতে আমি অপারেশন টিয়েটারে প্রবেশ করার আগে দস্তখত দিলাম। পরক্ষনে অপারেশন করার জন্য টিয়েটারে ডুকাল এর ঠিক ৪০ মিনিট পর ডাক্টার খোন্দাকার আছাদুজ্জামান আমাকে একা ডেকে বুকে জড়িয়ে বলল বাবা তোমার মায়ের অবস্থা খারাপ তখন আমি নিশ্চুপ হয়ে বললাম কি হয়েছে স্যার তিনি বললেন ক্যান্সার হয়েছে। যা আর তিন মাস পর হলে তোমার প্রিয় মা,কে হারাবে। তিনি বললেন, তোমার মা,কে যা যা খাওয়ার বা করার ইচ্ছা করে নাও। আমি এই কথা আজ পর্যন্তও বাবা, বোন, মামাসহ কোন আত্বীয়-স্বজনকে বলিনি। তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম চিকিৎসা করাব। নিয়ে গেলাম বাড়িতে তখন সবাইকে ডেকে বললাম প্রচুর টাকা প্রয়োজন বলার সাথে সাথে যার যার মত টাকা দিল। আমি মা,কে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলের ক্যান্সার বিশেষঙ ডা: এম এ আউয়ালের কাছে গেলাম। সেইও বলল ক্যান্সার পুরো শরীরে ছড়িয়ে গেছে তোমার মা,কে ইন্ডিয়া নিয়ে যেতে হবে। পরে আমি বললাম আমার মামা, বোন ও বাবার সাথে পরামর্শ করে বলব আপনাকে। তিনিও ভারতের ঠিকানা ও ডাক্টারের মোবাইল নাম্বারসহ সবকিছু রেডি করে দিল। ঠিক মা আমাকে কোথায় থেকে এই কথা শুনে বলল, বাবা আমাকে বাড়িতে নিয়ে যাও তোমাদের এত কষ্ট করতে হবেনা। আমার জন্য যে টাকা খরচ হচ্ছে স্ েটাকা দিয়ে তোমার বোনদের ভাল করে বিয়ে দিও। যাক লম্বা হয়ে যাচ্ছে। সেদিকে আর যাচ্ছিনা। এভাবেই ইন্ডিয়াতে না নিয়ে কেমোটেরাপি দিচ্ছি চট্টগ্রামে ২১ দিন পর পর। একটি টেরাপি ৫১ হাজার টাকা করে। এভাবেই দিতে দিতেই ৬ টি দিলাম। তখন ডাক্টারের কথা অনুযায়ী তিনমাস পার হল। ঠিক এভাবেই আরো তিনমাস মা কে বুকে পায়ছি। সময় যখন ৬ মাস হল সেই মধুমাখা মা,কে হারালাম। এভাবেই মায়ের স্বপ্ন ছিল বোন ও আমাকে মানুষ করে এলাকায় একটি শিক্ষিত পরিবার উপহার দিবে। ঠিক বড় আপা আলিম পাস করল আর আমি ও মেঝ আপা আলিমে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা করছি। পরে অবশ্য আমি কক্সবাজার পলিটেকনিক ইনস্টিউটে কম্পিউটার বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম কিন্তু অনিয়মিত হওয়ার কারনে এক সেমিস্টার বাদ গেল। পরে যথারীতি রংগীখালী মাদ্রাসা থেকে মেঝ ও আমি আলিম পাস করলাম। তেমনিভাবে মায়ের স্বপ্ন পুরন করছিলাম। আবার ছোট বোন দুইটাও মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করল। পরে হয়ে গেলাম এলাকার একটি শিক্ষিত পরিবার। পুরন হল মায়ের শেষ স্বপ্ন। বর্তমানে আমার ছোট বোনরা ডিগ্রিতে অধ্যায়নরত আছে। মেঝ আপার কামিল পাস করার পর বিয়ে হল। আর আমাদের বাবা ও বড় আপা মায়ের মত করে লালন পালন করে যাচ্ছেন। মা মরে যাওয়ার পর আমার ছোট মামা আমাদের বলল, মায়ের বড় আশা ছিল তোমরা বড় হয়ে মায়ের আশা পূরণ করে মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবে।
মা হারানোর পরেও আমার ছোট মামা মায়ের স্বপ্ন পুরনের লক্ষে সুদুর বিদেশে পড়ালেখা করার জন্য বিসা প্রসেস করছে। যথারীতি আমি ঢাকায় গিয়ে একটি কোরিয়ান কোচিং সেন্টারে ভর্তি হলাম। আমার ভর্তির সংবাদ শুনে বাবা, বোনরা অনেক খুশি কারন ভাই মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে যাচ্ছে। তাদের মন কানায় কানায় পূর্ণ হয়েছে। আমার বড় আপা একদিন আমাকে বলল, ভাই তোমাকে মা দেখার জন্য অস্তির হয়ে উঠে যেত প্রতিনিয়ত। কখন ছেলে বাড়িতে আসবে, কখন তাকে বুকে জড়াবে এবং বলবে “খোকা, তুই আমার জীবনের স্বপ্ন পূরণ করবি।” আমিও মাকে দেখার জন্য ব্যকুল হতাম। এর আগে যখন কক্সবাজারে থাকতাম মা ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করত “আজকে ত মুরগী জবেহ করছি কখন আসবি?” তখন মা,কে বলতাম,”মা, আজকে আমি অনেক ক্লান্ত আর এখনও ত তোমার জন্য কিছু কেনা হয়নি। আমি তোমার জন্য জুতো কিনে এরপর কাল সকালে বাসে রওনা দিব।“ এই বলেই মা ফোন রেখে দিল। ১০ মিনিট পর মা,র জন্য জুতো কিনার জন্য রুম থেকে বের হলাম এবং মায়ের জন্য সুন্দর জুতো খুজতে লাগলাম এবং অবশেষে সুন্দরটা পেলাম। আজ থেকে ৬ বছর আগে যখন আমার মা মৃত্যু বরণ বরল তখন আমার বড় আপা আমাকে কল দিল অতপর মোবাইলে রিং বাজতে লাগলো। মোবাইল নিয়ে কানে দিয়ে শুনলাম মোবাইলের অপর প্রান্তে কান্নার আওয়াজ! দেখলাম আমার ছোট বোন কান্না করতেছে। পরে জিজ্ঞেস করলাম “কি হয়েছে? সেতু এইভাবে কাঁদছে কেন?” বড় আপা বলল “ ভাই .আম্মু আর নেই।” এই সংবাদ শুনে কান্নায় ভেঙে পড়লাম এবং জুতো গুলো বুকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলাম। অবশেষে আমার মায়ের কাছে গিয়ে মায়ের বুকে গুজার ঠাই হলাম। মৃত্যুর আগে মায়ের স্বপ্ন পূরণের সেই হাসিমাখা মুখখানা দেখার সুযোগ হলনা। মায়ের জন্য কেনা সুন্দর জুতো আজ সে কাকে পড়াবো? এই বলে কাঁদতে লাগলাম পরক্ষনে বাড়িতে গিয়ে আমার আদরের মা কে জড়িয়ে ধরলাম মা মা অ মা আমাদের এতিম করে তুমি চলে যাচ্ছ? মা বলনা—এভাবে সবাই কান্না করছে—পরে অশ্র“সিক্ত হয়ে আমার দু-কাধে করে মা কে শেষ বিদায় জানালাম। বন্ধুরা এখনো মায়ের শোক ভুলতে পারছিনা। পরিশেষে মায়ের জন্য দোয়া চাই আমার মত অভাগা মা-হারা সন্তানদের জন্য দোয়া করবেন।

পাদটীকা : মানুষের জীবনের একমাত্র আশা পূরণ হলে সে আর বেচে থাকে না। যতদিন বেঁচে থাকে ততদিন সে আশার বলেই আশার মুখ দেখার জন্য বেচে থাকে। এই ঘটনাটিতে, মায়ের এক মাত্র আশা ছিল আমরা ভাই-বোন মিলে একদিন মানুষ হব।


Spread the love