উলিপুরে ঐতিহ্যবাহী গরুর-গাড়ি চোখে পড়ে না

63
Spread the love

ss-64মোঃ নূরবক্ত মিঞা উলিপুর (কুড়িগ্রাম) : বাংলাদেশের জনপ্রিয় পল¬ী গীতি সম্রাট আব্বাছ উদ্দিন ষাটের দশকে গরুর গাড়িতে কুড়িগ্রাম থেকে উলিপুর হয়ে চিলমারীতে এক অনুষ্ঠানে আসার পথে গরুর গাড়িতে বসেই ‘ও-কি গাড়িয়াল ভাই-হাকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে’, গানটি রচনা করে গাইতে গাইতে চিলমারী প্রবেশ করেন। এ জনপ্রিয় গানটি আজও বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম ও লোকমূখে শোনা গেলেও সেই গরুর গাড়ি এখন আর চোখে পড়ে না। গরুর গাড়িকে নিয়ে আরও নানান রকম জনপ্রিয় গানের মধ্যেÑ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে ধুত্তুর ধুত্তুর ধুত্তুর ধু সানাই বাজিয়ে যাবো তোমায় শ্বশুর বাড়ি নিয়ে’ এ গানটি এখন বিয়ে বাড়িতে মাইকে শোনানো হলেও কুড়িগ্রামে উলিপুর-সহ কোন উপজেলায় বউ সাজিয়ে গরুর গাড়িতে শ্বাশুড় নিয়ে যেতে দেখা যায় না। পল¬ী গীতি ও ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাছ উদ্দিনের ‘হাকাও গাড়ি তুই চিলমারী বন্দরে’Ñগানটি সাড়া দেশে চিলমারীর ব্যাপক পরিচিতি ঘটালেও হারিয়ে যাচ্ছে সেই গরুর গাড়ি। ২০ থেকে ২৫ বছর আগেও লক্ষ্য করা গেছে গরুর গাড়ি ছাড়া বিয়ের কনে ও বর যাত্রীদের যাতায়াত কল্পনাই করা যেত না। বিয়েতে গরুর গাড়ির ব্যবহার গ্রামবাংলার একটি অন্যতম ঐতিহ্য। এ ছাড়া এ অঞ্চলে এক এলাকা হতে অন্য এলাকার হাট-বাজারে পণ্য বহনে একমাত্র ভরসা ছিল গরুর গাড়ি। ফসল ঘরে তোলা (ধান কাটার পর) বা বাজারজাত করা হত গরুর গাড়িতে। কৃষকের ঘরে ঘরে শোভা পেত নানা ডিজাইনের গরুর গাড়ি। এসব গরুর গাড়ি অন্যদের মালামাল পরিবহনে ভাড়া দেয়া হত। বর-কনে, আত্মীয়-স্বজন ও অনুষ্ঠানাদির লোকজন পরিবহনে ব্যবহার করা হত নানা রংয়ের সজ্জিত ছৈ-ওয়ালা গরুর গাড়ি। গরুর গাড়ির পরিচালককে বলা হত গাড়োয়ান (গাড়িয়াল)।আগের দিনে গ্রাম বাংলার মানুষ, নতুন ধান কাটার নবান্নের উৎসবের সময় গরুর গাড়ির প্রতিযোগিতায় মেতে উঠত। রং, বে-রংয়ে সাজানো গরু ও গাড়ির প্রতিযোগিতায় কার গাড়ি আগে যাবে তা দেখার জন্য জনতার ঢল নামত বিশাল খেলার মাঠে। এ ‘গরুর-গাড়ি’ খেলাটিও হারিয়ে গেছে কালের আতর্তে। যুগের পরিবর্তনের ফলে মানূষজন গরুর গাড়ির ব্যবহার বাদ দিয়ে এখন ওই একই কাজে ব্যবহার করছে-রিক্সা, ভ্যান, অটোরিক্সা, সিএনজি, ভটভটি, নছিমন-করিমন, মাইক্রো, কার ও বাস-ট্রাকসহ ইঞ্জিন চালিত নানান বাহন। তবকপুরের আব্দুল গনি গাড়িয়াল জানান, তিনি গরুর গাড়িতে ভাড়ায় মানুষ ও নানান মালামাল বহন করত বলে তার নামের সাথে গাড়িয়াল (গাড়ি-ওয়ালা) শব্দটি যুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, বিয়ের সময় গরুর গলায় ঘন্টা বাঁধিয়ে নানান রঙে গরু ও গাড়ি সাজিয়ে গরুর গলায় ঘুগরা ও ফুলের মালা পরিয়ে বর-কনে আনা নেয়া করতাম। গরুর গলার ঘুগরার বাজনা আর সারিবদ্ধ গরুর গাড়ি সে এক অপরুপ শোভা বর্ধন করত। গরুর গলার ঘন্টা,ঘুগড়া ও বর-কনে যুাত্রিদের হৈ-হুলে¬ালের শব্দে গ্রামের নারী-পুরুষেরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতো রাস্তার ধারে। এমন দৃশ্যের কথা এখন আর ভাবাই যায় না। বাংলা নববর্ষ এলেই এদেশের মানুষ নিজেদের বাঙালি প্রমান করার জন্য গ্রামীন জীবনের নানা অনুসঙ্গ নিয়ে মেতে উঠেন। তখন বাংলা নববর্ষ বরণ শোভাযাত্রায় কিছু গরুর গাড়ি দেখা যায়। কালের আবর্তে গ্রাম-বাঙলার ঐতিহ্যবাহী সেই গরুর গাড়ি হারিয়ে যাচ্ছে। এখন আমাদের সেই গরুর গাড়ি প্রবীনদের শুধুই স্মৃতি আর নবীনদের কাছে রূপকথার গল্প। দ্রুত চলে যাওয়া সময়ের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে গ্রামীন ঐতিহ্য এখন গ্রাম-বাংলার মানুষজনও হয়ে যাচ্ছেন যান্ত্রিক। এ কারনে শহরের ছেলে-মেয়ে তো দূরের কথা, বর্তমানে গ্রামের অনেক ছেলে-মেয়েরাও গরুর-গাড়ি শব্দটির সাথে পরিচিত নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গরুর গাড়ি যাদুঘরে গিয়ে দেখতে হবে।


Spread the love