গভর্নরের পদত্যাগ : দুই ডেপুটিকে অপসারণ ব্যাংক ও আর্থিক বিভাগের সচিব ওএসডি : অর্থ লোপাটে বাংলাদেশ ব্যাংকের মামলা

74
Spread the love

gygনিজস্ব প্রতিবেদক : হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থ লোপাটের ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রিজার্ভ চুরি নিয়ে চাপে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমানের পদত্যাগের পর দুই ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানা ও আবুল কাশেমকেও সরিয়ে দিয়েছে সরকার। এদিকে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের আট কোটি ডলার লোপাটের প্রেক্ষাপটে গভর্নরের পদ ছাড়লেন আতিউর রহমান। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার মধ্যে তিনি গতকাল মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে পদত্যাগ পত্র দেন বলে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের শীর্ষ একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ্যাকাউন্টিং এ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক মোঃ জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এই মামলা করেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ আইন ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনে করা এই মামলায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলমকে ওএসডি করা হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এদিন বিকেলে তার বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বিদায় নেন তিনি। এ সময় ব্যাংক সচিব হিসেবে আজ তার শেষ কর্মদিবস হিসেবে ড. আসলাম উল্লেখ করেন বলে সূত্রগুলো জানায়। ড. এম আসলাম আলম অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব হিসেবে ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এর পূর্বে তিনি বাংলাদেশ সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে সকালে গুলশানে নিজের বাসায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আতিউর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী চাইলে’ তিনি পদত্যাগের জন্য প্রস্তুত আছেন। আমি অপেক্ষা করছি, প্রধানমন্ত্রী কী বলেন। আমি পদত্যাগ করলে যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভালো হয়, দেশের ভালো হয়, তাহলে পদত্যাগ করতে আমার দ্বিধা নাই। আমি পদত্যাগপত্র লিখে বসে আছি। প্রধানমন্ত্রী বলার সঙ্গে সঙ্গে আমি পদত্যাগ করব। এ সময় গভর্নরের হাতে পদত্যাগ পত্র দেখা যায়। ইতোপূর্বে রিজার্ভের অর্থ লোপাটের ঘটনায় গোপন করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশের মুখে গতকাল মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে পদত্যাগ পত্র জমা দেন গভর্নর আতিউর রহমান। তার পদত্যাগের ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে সাবেক অর্থ সচিব ফজলে কবিরকে নতুন গভর্নর করার কথা সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান মুহিত। পাশাপাশি ঘটনা তদন্তে সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি কমিটি করা হয়েছে, যাতে প্রাথমিক ভাবে তিন সদস্য রাখার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। শেরে বাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে এক প্রাক বাজেট আলোচনায় গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম ও নাজনীন সুলতানাকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ব্যাংকের দুই ডেপুটি গভর্নর দুই পদে শিগগিরই নতুন নিয়োগ দেওয়া হবে। এই দু’জন বাদ পড়ায় এখন ডেপুটি গভর্নর পদে আছেন আবু হেনা মোঃ রাজী হাসান ও এস কে সুর চৌধুরী। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, গভর্নর তো হয়ে গেছে। সাবেক অর্থসচিব ফজলে কবিরকে গভর্নর করা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ফজলে কবির বর্তমানে নিউইয়র্কে আছেন। কবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, আজকেই অ্যানাউন্স হবে। ১৮ মার্চ ফজলে কবির দেশে ফিরবেন বলেও জানান তিনি। আতিউর রহমানের পদত্যাগের পর অর্থ লোপাটের ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে কি-না জানতে চাইলে মুহিত বলেন, তদন্ত তো অলরেডি করা হয়েছে। কমিটি বিষয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, ওটা বলেছি তো। ড. ফরাস উদ্দিন, তার তো কমিটি অলরেডি আই হ্যাভ অ্যানাউন্সড। দ্যাট উইল বি দেয়ার। ওই কমিটিতে কয়জনকে রাখা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপাতত তিনজন। আমি অপশন রাখছি টু গিভ মোর। এদিকে গভর্নর পদত্যাগ করার পর পূর্ব ঘোষিত সংবাদ সম্মেলন বাতিল করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বাংলাদেশের প্রথম নারী ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানার চাকুরির মেয়াদ স¤প্রতি শেষ হওয়ার পর তা চলতি বছরের ১৪ জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। আবুল কাশেমের চাকুরির বাড়তি মেয়াদও আগামী আগস্টে শেষ হওয়ার কথা ছিল। নতুন গভর্নর : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করা ফজলে কবিরের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৮০ রেলওয়ের সহকারী ট্রাফিক সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে। এর তিন বছরের মাথায় প্রশাসনে যোগ দেন তিনি। ২০১২ সালে অর্থ সচিবের দায়িত্বে আসার আগে জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও ছিলেন তিনি। ফজলে কবিরের স্ত্রী মাহমুদা শারমিন বেনু জন-প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব। ফিলিপিন্সের ডেইলি ইনকোয়ারারে ২৯ ফেব্র“য়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার লোপাটের খবর এলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার ঝড় ওঠে। তদন্তে জানা যায়, গত ৪ ফেব্র“য়ারি সুইফট মেসেজিং সিস্টেমে হ্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে সঞ্চিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই অর্থ ফিলিপিন্সের একটি ব্যাংকে সরিয়ে ফেলা হয়। শ্রীলঙ্কার একটি ব্যাংকে আরও ২০ মিলিয়ন ডলার সরানো হলেও বানান ভুলের কারণে সন্দেহ হওয়ায় শেষ মুহূর্তে তা আটকে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক শুরুতেই বিষয়টি টের পেলেও কর্মকর্তারা তা গোপন করে যাওয়ায় অর্থমন্ত্রী মুহিতকে এক মাস পর তা পত্রিকা পড়ে জানতে হয়। অর্থ লোপাটের বিষয়টি চেপে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেভাবে তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে তাকে ‘অযোগ্যতা’ আখ্যায়িত করে ‘ক্ষুব্ধ’ মুহিত গত রবিবার বলেছিলেন, এই ‘স্পর্ধার’ জন্য ‘অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।


Spread the love