চোখে দেখা অতুলনীয় আশেকে রাসুল (সা:) ও ১২ দিনব্যাপী ঐতিহাসিক ঈদে মিলাদুন্নবী (সা:) শীর্ষক সেমিনারে আমার অংশগ্রহণ

110
Spread the love

সাফাত বিন ছানাউল্লাহ্ : এ কোন অবয়ব! আসমান থেকে তক্ষুনি নেমে এসেছে ফেরেস্তা। ফেরেস্তা তো দেখা যায়না, মানুষ দেখা যায়। ফেরেস্তাদের প্রতিচ্ছবি মনে হয় এমনই। মুখপানে তাকাতে পারিনি যতবার দেখেছি বেশীক্ষণ। নুরের আলো বিচ্ছুরিত হয়ে ছড়িয়ে যেতো সর্বত্র। তিনি তো যুগের রাহবার, পথপ্রদর্শক, গৌছে জামান। প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে শুরু করে যুগে যুগে মহান আল্লাহ প্রেরিত অবতারদের দেখার, সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ হয়নি! কিন্তু, দেখেছি – আখেরি পৃথিবীর দিশেহারা অগন্তি মানুষদের পথপ্রদর্শক, ইমামে আহলে সুন্নাত, পীরে কামেল, শাইকুল আরব ওয়াল আজম, ওস্তাজুল ওলামা, হযরতুলহাজ্ব আল্লামা কাজী মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম হাশেমী (রাহঃ) কে। কিছুসময়ের জন্য স্নেহ লাভ করেছি। নুরানি হাতে গুনাহগারের মাথায় বুলিয়ে নিয়েছি। এর চেয়ে প্রশান্তি আর কী হতে পারে? শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য নয় সকল ধর্মাবলম্বীরা ও হুজুরের কাছে এসে দোয়ার ভিখারি হয়েছেন। প্রত্যেক যুগে মহান আল্লাহ গাউস পাঠাবেন এটা প্রিয় রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর পবিত্র ঘোষণা।
ছোটকাল থেকে শুনে আসছিলাম হুজুরের কথা। পেপারে পড়েছি, মোবাইলে ওয়াজ শুনেছি, তাছাড়া মরহুম বাবাও হুজুরের অসম্ভব একজন ভক্ত ছিলেন। কতবার দেখা করবো কল্পনা করেছি কিছুতেই আশা পূরণ হচ্ছিলনা। এভাবেই দিন,মাস,বছর কেটে যায়। আমাদের বাড়ির পুরোনো আত্মীয় দোহাজারী জামিজুরীর কাজী বাড়ির কাজী শাহেদ নুরের সাথে খালাতো বোন আদিবার বিয়ে হওয়ায় আবার হালে পানি পায় আত্মীয়তা। আসা-যাওয়া বাড়তে থাকে। এর মধ্যে শাহেদ ভাইয়ের চাচাতো বোনের বিয়ে দিয়েছেন ইমামে আহলে সুন্নাতের তৃতীয় শাহজাদা মাওলানা কাজী বোরহান উদ্দিন হাশেমীর সাথে। পুষে রাখা আকাঙ্খার মাঝে পরম সৌভাগ্য। অবশেষে ২০১৫ সালের পবিত্র মাহে রবিউল আওয়াল মাসে দরবারে হাশেমীয়া আলিয়া শরীফে অনুষ্ঠিত প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে অনুষ্ঠিত হওয়া ঐতিহাসিক ১২ দিনব্যাপী ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শীর্ষক সেমিনারে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়। সম্পর্কে দুলাভাই বোরহান হাশেমী ভাইয়ের সাথে পরিচয় সুত্রে ঐ বছর ১২ দিন থাকবো বলে নিয়ত করেছিলাম। তাই দুলাভাই – দরবারের সম্মুখে আহসানুল উলুম আলিয়া মাদ্রাসার হোস্টেলে থাকা ও নিজ বাসায় খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। ২০১৫ সেজন্য জীবনে স্মরণীয় এক বছর হয়ে থাকবে। মাহে রবিউল আওয়াল শরীফের শুরুতে নিজের বাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সাথে নিয়ে দরবারে চলে গেলাম।
প্রথমে দরবারের মাজার জিয়ারত করে বাসায় গিয়ে কুশলাদি বিনিময়ের পর মাদ্রাসার হোস্টেলে ফিরে এলাম। এখানেও অনেকের পরিচিত হলাম। যাদের নাম মনে পড়ছে – মাওলানা সৈয়দ জাহেদুল ইসলাম, মাওলানা আবদুস শুক্কুর প্রমুখ। সবার নাম মনে নেই! ওনারা একই কক্ষে ছিলেন।
বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে বের হলাম মাহফিল প্রাঙ্গণে। সুবহানাল্লাহ, এ যেন জান্নাতি পরিবেশ। বিশাল মাহফিলের মঞ্চ মনোমুগ্ধকর। মাহফিলের প্রতিদিনকার কর্মসূচি বই পড়ে জানলাম ১২ দিনই বিভিন্ন খতম আদায় করা হয় এবং খতম শেষে মুনাজাত পরিচালনা করেন স্বয়ং ইমামে আহলে সুন্নাত। চারদিক ঘুরে আমিও খতমে অংশগ্রহণ করি। কিছুক্ষণ পর তাশরীফ নিয়ে আসলেন হুজুর কেবলা (রাহঃ)। সামনে মাইক দেয়া হলে কিছুক্ষণ নুরানি তাকরীরের পর মুনাজাত করলেন। শত ছুঁইছুঁই বয়সেও ওনার কথা বলার স্পৃহা দেখে মুগ্ধ হলাম। নিশ্চয় মহান আল্লাহ ও প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গায়েবি মদদ। আশেপাশে বসেছিলেন দেশবরেণ্য ওলামায়ে কেরাম। আজ অনেকেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেছেন। ইন্তেকাল প্রাপ্ত হুজুরদের মধ্যে মনে পরে – হাফেজুল হাদিস, আল্লামা জাফর আহমদ বদরী (রাহঃ), মোজাহিদে আহলে সুন্নাত, আল্লামা শফিক আহমেদ (রাহঃ) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নাম না জানা আরো অনেক ওলামায়ে আহলে সুন্নাত যারা দরবারের সাথে সম্পৃক্ত থেকে দ্বীনের খেদমত করে জান্নাতের পথে চলে গেছেন ওনাদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। মুনাজাতের ভিতরেই তাবাররুকাত বিতরণ চলছে। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা, হুজুর কেবলার নাতীরা পাশে বসে দোয়া নিচ্ছে। অদ্ভুত এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে দরবারে হাশেমীয়ায়। আসরের নামাজের পরপরই দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান আলেম-ওলামার তাকরীরের মাধ্যমে মাহফিলের সুচনা। শুরুতে স্বনামধন্য শায়েররা হামদ, নাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুরের মূর্ছনায় পুরো এলাকা মাতিয়ে রাখেন।
মাহফিল চলাকালীন সময়ে বোরহান ভাই সহ অন্যান্যদের সাথে ইমামে আহলে সুন্নাতের সাক্ষাৎ লাভের উদ্দেশ্যে যাই। হুজুরা শরীফে প্রবেশ করেই বিশাল মানুষ আর ওলামায়ে কেরামের জটলা দেখলাম। সবাই দোয়া প্রার্থী। হুজুরায় প্রবেশ করেই হাতের ডানে পর্দা আবৃত অবস্থায় শুয়ে আছেন ইমামের সহধর্মিণী মরহুমা আলহাজ্বা কাজী মুছাম্মৎ হুরে জান্নাত আল হাশেমী (রহঃ)। স্বামীর আদর্শে বহু গুণে গুণান্বিত ছিলেন তিনিও। রাবেতায়ে ওয়াকত, ফাতেমায়ে জামান বলতে যা বুঝায় একেবারে কামেলীন মহিলা। যিনি গত ২১ শে জানুয়ারি সৃষ্টিকর্তার ডাকে সাড়া দেন! ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। সারাজীবন ইবাদত, বন্দেগি তো করেছেনই পাশাপাশি সুন্নীয়তের খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন বিভিন্নভাবে।
অনুমতি নিয়ে পায়ে ধরে সালাম করতেই শয্যাপাশে বসতে বললেন। বাড়ি কোথায়?  এটা ওটা জিগ্যেস করলেন। বাড়ি সাতবাড়ীয়া শুনে আনন্দিত খুশি হয়ে বললেন – হাজীপাড়া আমার নানাবাড়ি। তুমি তো আমার নানার দেশের! ওনার বাবার বাড়ি পটিয়া উপজেলার বাহুলী গ্রাম। পটিয়া আমার নানাবাড়ি ও নানার নাম শুনে আদর করলেন আমাকে। আহা! একজন মহীয়সীর মমতার আদর জীবনের ষোলকলাই পূর্ণ করে দেয়। ভীড় কিছুটা কমলে হুজুর কেবলা (রাহঃ) কে কদমবুসি করলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন ইমাম। জীবনটা পরিপূর্ণ। স্বভাবসুলভ জিগ্যেস করলেন – বাড়ি কোথায়? কী কর ইত্যাদি। চন্দনাইশের সাতবাড়ীয়া বলাতে এক পর্যায়ে বললেন – এক সময় দোহাজারী, সাতবাড়ীয়া, চন্দনাইশ কত মাহফিল করেছি হিসেব নেই। নব্বইয়ের কোটা পার করা একজন মানুষের স্মৃতিশক্তি এত প্রখর হয় কিভাবে! কামেল অলির সোহবত পেয়ে সেদিন ধন্য হয়েছিলাম।
দোয়া নিয়ে মাহফিলে শরিক হয়ে নুরানি বিষয়ভিত্তিক নুরানি তাকরীর শ্রবণ করে নিজের ঈমান ও হৃদয়কে শীতল করাটাই হচ্ছে মূল লক্ষ্য। পেন্ডেলেই ফজর থেকে শুরু করে সব ওয়াক্তের নামাজ জামাতে আদায় করা হয়। এশার নামাজের পরপরই হুজুর মঞ্চে আসেন, যারা বয়ান করছেন ওদের ওয়াজ শুনেন। মাঝে কোন শায়ের হামদ, নাত পরিবেশন করলে উপযুক্ত হাদিয়াও দেন। দেশের গণ্ডি অতিক্রম করে বিশ্বের অনেক পীর মাশায়েক, ওলামায়ে কেরাম আসেন এই ঐতিহাসিক বরকতময় মাহফিলে। ভারতের বিশ্ববিখ্যাত দরবার আজমির শরিফ, খানকায়ে মুনঈমিয়া, দরবারে আশরাফিয়া, দরবারে সরকারে মিনা, দরবারে আলা হযরতের প্রতিনিধি, ভারতের খ্যাতিমান ওলামায়ে কেরাম, পাকিস্তানের ওলামায়ে কেরাম, আরব আজমের বহু আলেমেদ্বীন এ মাহফিলে অংশগ্রহণ করেছেন। দরবারে হাশেমীয়া আলিয়া শরীফে প্রায় প্রতিবছর কয়েকদিন অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। বিভিন্ন দেশের আলেম-ওলামারা ইমামকে কিরকম সম্মান করতেন ভাষায় প্রকাশের মতো নয়। মাহফিল চলে রাত ১২ টা পর্যন্ত, শেষ দিন সারারাত ব্যাপী। প্রতিদিনই হুজুর কেবলা (রাহঃ) এর মুরিদদের হাদিয়া দেয়া গরু, মহিষ, দুম্বা জবাই হতো আর মিলাদ-কিয়ামের পর হাজার হাজার আগতদের কাতারবন্দি খাওয়ানো হয়।
প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসা ঐতিহাসিক ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শীর্ষক সেমিনারের প্রেক্ষাপটে আজ বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ১২ দিনব্যাপী মাহফিল হয়ে আসছে। এটা নিঃসন্দেহে ইমামে আহলে সুন্নাতের দুরদর্শিতার প্রমাণ। হুজুর কেবলা (রাহঃ) বাংলা সহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ কষ্টসাধ্য সফর করে পবিত্র ইসলামের বাণী জনসম্মুখে পৌঁছে দিয়েছেন। ইমামে আহলে সুন্নাত, ওস্তাজুল ওলামা, লক্ষ লক্ষ আলেম গড়ার কারিগর, আলা হযরত, পীরে কামেল, মুর্শিদে বরহক, হযরতুলহাজ্ব আল্লামা কাজী মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম হাশেমী (মাঃজিঃআ) একজন দেশপ্রেমিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকি হায়েনা ও দেশীয় রাজাকাররা সুন্নি প্রতিষ্ঠান গুলোতে ঘাটি করতে চাইলে তিনিই সর্বপ্রথম বাঁধা দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। তারও আগে তিনি মহান ভাষা আন্দোলনে অন্যতম সৈনিক হিসেবে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সোচ্চার কণ্ঠে প্রতিবাদ করেছিলেন। হাশেমী হুজুরকে শুধু বাংলাদেশ নয় বহির্বিশ্বের খ্যাতিমান ওলামা ও পীর মাশায়েখরা বিভিন্ন খেতাবে সম্মানিত করেছেন। হুজুর সুদূর আমেরিকাতে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে যে ভূমিকা রেখেছেন তাঁরই ফলস্রুতিতে আজ দেশটিতে আস্তে আস্তে করে পবিত্র ইসলামের সুবাতাস বইছে। শান্তির বাণী জনসম্মুখে ছড়িয়ে তিনি ধর্ম প্রচার করেছেন। জামায়াত – হেফাজতের মতো জঙ্গিবাদী কায়দা ও রক্তগঙ্গা প্রবাহিত করে নয়। সুফিবাদ মতাদর্শে আহবান জানিয়ে হুজুর প্রতিনিয়ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ গড়তে মুরিদদের প্রতি নছিহত করতেন।
মহাপুরুষ ইমাম হাশেমী (রাহঃ)র জীবন ও কর্ম এতই ব্যপক, বিস্তৃত যে লিখে শেষ করা যাবেনা। লেখকরা ওনার বিশাল জীবনীগ্রন্থ লিখবেন। ২০১৮-২০১৯ সালে দুর্ভাগ্যবশত যেতে পারিনি দরবারে। হুজুরের সান্নিধ্যে ও যাওয়ার তৌফিক আর অর্জন করিনি। এরই মধ্যে ইমাম অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বড়ো ইচ্ছে ছিল দেশ মহামারীর ক্রান্তিলগ্ন কাটিয়ে উঠলে একবার গিয়ে ইমামের সোহবত হাসিল করবো। আর সেদিন আসবেনা! মহান আল্লাহ, প্রিয় মানুষটিকে নিজের কাছে ডেকে নিলেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর গভীর চিন্তা কাজ করছিলো। এত তাড়াতাড়ি সুন্নি জাহানকে এতিম করে চলে যাবেন কল্পনা করিনি। যুগের শ্রেষ্ঠ মনীষীর তিরোধানে আকাশ-বাতাস ও রোনাজারি করছিলো কখনো গুমরে, কখনো ফুঁপিয়ে, কখনো স্তব্ধতার চাদরে ঢেকে!
হুজুর কেবলা (রাহঃ) সম্পর্কে কিছু লেখার জ্ঞান আমার নেই। সামান্য বরকতের উদ্দেশ্যে আমার ক্ষুদ্র প্রয়াসে ভুল-ত্রুটি থাকলে পাঠকরা ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখবেন। হুজুর কেবলা, ইমামে আহলে সুন্নাত (রাহঃ) র রুহানি ফুয়ুজাত মহান আল্লাহ প্রিয় (রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উছিলায় আমাদের দান করুন … আমিন! আমিন! বেহুরমাতি সাইয়িদুল মুরসালিন ।

Spread the love