জলে ভেজা আয়লান: কাঁদালো সবার প্রাণ

112
Spread the love

bdjahan॥ আতিকুর রহমান নগরী ॥
শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বে অকুল দরিয়ায় ডুবে গেলো নূরানী একটি চেহারা। অথৈ সমুদ্রে পড়ে প্রাণ হারালো ফুটফুটে একটি শিশু। সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে গেলো বাবা-মায়ের স্বপ্ন। ডিঙি নৌকা থেকে হাত ফসকে পড়ে যায় সমুদ্রের বুকে। মাসুম-বেগুনা ছোট্র শিশুকে গিলে ফেলার সাহস করেনি সমুদ্র। সে তার বুকে রাখতে নারাজি প্রকাশ করে ঢেউয়ে ভাসিয়ে দিয়ে শুকনোয় রাখে।
প্রভাতে পূর্ব দিগন্ত থেকে উদিত সূর্যের কিরণ যখন সমুদ্রের পাড়ে বালিকণায় পড়ে চিকচিক করছে ঠিক তখন ক্যামেরা বন্দী হলো জলে ভেজা আয়লান’র নিথর দেহ। বিশ্ববাসির ঘুম ভাঙিয়ে ঘুমিয়ে আছে সে। জীবনের স্বপ্ন সমুদ্রে বিলিয়ে দিয়ে ঘুমোচ্ছে। সমুদ্রের চোরাবালির বুকে পড়ে আছে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বে সিরিয় শরণার্থী শিশু আয়লান কুর্দি।
পরনে লাল টি-শার্ট আর নীল প্যান্ট, আর কেডস। অক্ষত আছে সবই কিন্তু দেহটি নিথর। সমুদ্র্রতটে উপুড় হয়ে পড়ে আছে ছোট্ট শিশুটি। এমন একটি ফটোগ্রাফেই গত কয়েকদিন ধরে বিহ্ববল বিশ্ব। প্রাণহীণ শিশুর নির্বাক ছবিটি ধিক্কারের আলোড়ন তুলেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সকল মহলে। বেদনার্ত মানুষ ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের ক্ষোভ, ধিক্কার উগড়ে দিচ্ছেন। স্ট্যাটাসে স্ট্যাটসে অভিবাসন নিয়ে বইছে নিন্দা আর প্রশ্নের ঝড়। প্রোফাইল আর কাভারে ছবি রেখে বিশ্বজুড়ে শোক জানাচ্ছেন মানুষ।
ধিক! শত ধিক! তোমাদের জন্য মাতৃকুলের শিশু আজ সমুদ্রের কুলে। তোমাদের রক্তচক্ষু দেখে ভয়ে পাড়ি জমিয়েছিল তারা  অথৈ সমুদ্রে। যাওয়া হলো না। তাদের স্বপ্ন সমাধিতে রূপ নিল। দুষ্টমিতে মেতে উঠবে না। ভাইয়ের সাথে খেলা করবে না। বাবার ঘুমও ভাঙাবে না আয়লান। মা রেহান আর ভাই গালিবও চলে গেছেন তার না ফেরার দেশে। স্ত্রী-পুত্রসহ পরিবারকে হারিয়ে বাবা আবদুল্লাহ কুর্দি পাগল প্রায়।
প্রিয়তমা, সহধর্মিনী, জীবনসঙ্গিনী স্ত্রী রেহান আর কলিজার টুকরো দু’টো সন্তানকে একসাথে হারানোর শোকে কাতর আবদুল্লাহ কুর্দি দাফনের সময় বলেন, আমার ছেলে আয়লান কলা খুব পছন্দ করতো। আমি প্রতিদিন কবরে কলা দিয়ে আসবো। জানি কবর তা খাবে না। তবুও দিয়ে আসবো। সকালে আমার ঘুম ভাঙানোর কউে নেই। কবরের পাশে কাটিয়ে দিবো বাকিটা জীবন। সিরিয়ায় বিরাজমান পরিস্থিতির অবসান হোক। এ দ্বন্দ্ব বন্ধ হোক। আয়লানের জীবনে শেষ হোক।
ইউরোপের শরণার্থী সংকট কতটা গভীর এই একটি ছবিই তা বুঝিয়ে দিয়েছে। শিশুটির নাম আয়লান কুর্দি। বয়স তিন বছর। সিরিয়া থেকে আসা একদল শরণার্থী তুরস্ক হয়ে বৃহস্পতিবার গ্রিসের কস্ দ্বীপে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু যাত্রাপথে সাগরে নৌকাডুবিতে ১২ জন মারা যায়। পাঁচ বছর বয়সী আয়লান কুর্দি ছিল সেই দলে। নৌকা ডুবিতে সে তার মায়ের সাথে প্রাণ হারায়। নৌকাডুবির পর আয়লানের মরদেহ ভেসে আসে সমুদ্র সৈকতে।
২ সেপ্টেম্বর বুধবার দুর্ঘটনার শিকার হয় আবদুল্লাহ কুর্দির পরিবার। নৌকা ডুবে গেলে তাঁর হাত ফসকেই সাগরের ঢেউয়ে তলিয়ে যায় দুই ছেলে তিন বছর বয়সী আয়লান আর পাঁচ বছর বয়সী গালিব। ভূমধ্যসাগর কেড়ে নিয়েছে ওদের মা রেহনাকেও।
তুরস্কের সমুদ্রসৈকতে পড়ে থাকা আয়লানের ছোট নিথর দেহের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বড় ধরনের ঝাঁকুনি খায় অভিবাসী-সংকট নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ইউরোপ। ঘুম ভাঙে বিশ্ববাসীরও। সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগের অনলাইন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে আয়লানের ছবিটি অনেকখানি পাল্টে দিয়েছে জনমত। সাম্প্রতিক শরণার্থী সমস্যা নিয়ে ইউরোপের যে নেতারা এত দিন নির্লিপ্ত ছিলেন, তাঁরাও এখন মানবিক উদ্যোগের পথে এগোনোর কথা বলছেন। অন্তত দুই লাখ অভিবাসীকে গ্রহণ করতে ইউরোপকে অনুরোধ করেছে জাতিসংঘ।
শিশু আয়লানের মরদেহ দুর্ঘটনার দিনই তুরস্কের আরেকটি সৈকতে ভেসে আসে। এর ১০০ মিটার দূরে পড়ে ছিল তার ভাই গালিবের মরদেহ। মায়ের মরদেহ পাওয়া যায় কাছের আরেকটি সৈকতে। তুরস্কের পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। বিপজ্জনক উপায়ে ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে ডুবে এ বছর আড়াই হাজার মানুষ প্রাণ হারালেও আয়লানের ছবিটি আলাদাভাবে মর্মস্পর্শ করেছে বিশ্ববাসীর। ইতিমধ্যে কার্যত শরণার্থীদের বিপন্নতা আর মরিয়া অবস্থার প্রতীকে পরিণত হওয়া ছবিটিতে দেখা যায়, সৈকতের বালুতে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে আয়লান। তার পরনে লাল জামা, নীল শর্ট প্যান্ট, পায়ে কেডস।
আলোচিত ছবিটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতায় ছাপা হয়। এতে রাজনীতিক ও জনসাধারণ—উভয়ের মধ্যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয়। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী মানুয়েল ভালস টুইটারে লেখেন, ‘ইউরোপকে সংহত করতে আমাদের জরুরি ভিত্তিতে তৎপর হতে হবে।’
ছবিটি প্রকাশিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফ্রান্স ও জার্মানি দ্বিধাদ্বন্দ বাদ দিয়ে একমত হয় যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) উচিত, নির্ধারিত সংখ্যা (কোটা) অনুযায়ী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জায়গা দিতে সদস্যদেশগুলোকে বাধ্য করা। শরণার্থী ও অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও আয়লানের ছবিটি দেখে ‘গভীরভাবে প্রভাবিত’ হয়ে ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁর দেশ কয়েক হাজার সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দেবে।
আয়লানের হৃদয়বিদারক ছবিটি প্রকাশের পর শরণার্থীদের জন্য তহবিল সংগ্রহের পরিমাণও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) মাত্র দুই দিনে সারা বিশ্ব থেকে এক লাখ ডলার সহায়তা পেয়েছে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিও সিরিয়া ও ইরাকের শরণার্থীদের জন্য জরুরি তহবিল সংগ্রহ শুরু করার পর অভাবনীয় সাঙ পেয়েছে।
ছবিটির আলোকচিত্রী তুর্কি সাংবাদিক নিলুফার ডেমির বলেছেন, ‘যখন বুঝতে পারলাম ছেলেটাকে বাঁচানোর কোনো উপায়ই নেই, কমপক্ষে ওর ছবি তুলি বেদনাদায়ক ঘটনাটা দেখুক সবাই। আশা করি, এই ছবি যে ধাক্কা দিয়েছে, তা চলমান সংকট সমাধানে সহায়ক হবে।’
ইউরোপে তীব্র হয়ে উঠেছে অভিবাসন সংকট। প্রতিদিনই সাগর ও স্থলপথে আসা অভিবাসন প্রত্যাশীদের চাপ সামলাতে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে ইউরোপবাসীর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক মানবিক সংকট হয়ে এসেছে এই অভিবাসন সমস্যা। প্রতিদিনই ভূমধ্যসাগরে নেমে ‘অজানার উদ্দেশে’ পাড়ি জমাচ্ছেন হাজারো মানুষ। চলতি বছরে ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমানো অভিবাসন প্রত্যাশীর সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে গেছে। অভিবাসন প্রত্যাশীদের সবচেয়ে বেশি এসেছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে। এরপরে আছে ইরিত্রিয়া, নাইজেরিয়া আর সোমালিয়ার দরিদ্ররা। এই তালিকায় আছে বাংলাদেশও।
ইউরোপের মত এশিয়া আঞ্চলেও এর ভয়াবহতা দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলে মানবপাচার উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের অনেক মানুষকে পাচার করা হচ্ছে। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে এবং ভাগ্যন্বেষণে উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া যেতে মৃত্যুর ঝুঁকি নিচ্ছেন শ্রমিকরা। বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ এ ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেঁছে নিচ্ছেন। এই ভয়াবহ অবস্থার পেছনে রয়েছে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, এশিয়া অঞ্চলের বেকারত্ব, আফ্রিকা অঞ্চলের অনিরাপত্তা ও অনিশ্চিত জীবনসহ আরো নানা কারণ।
এসব কীসের লড়াই। করো কী বড়াই। মানবতা ডুবে যাক। নারী-শিশু মরে যাক। এরই নাম নয়তো ধর্ম, আর এটা তো নয় তোমার কর্ম। আমরা চাইনা বিশ্ববিবেকরা চান না আইলানরা দরিয়ার হাত ফসকে পড়ে যাক। বন্ধ করো এবার শিয়া-সুন্নি লড়াই।
আইলান চলে গেছে। রয়ে গেছে ১০লক্ষ সিরিয় শরণার্থী অবুঝ শিশু। দোহাই লাগে তাদের পানে একবার তাকাও। সময় এসেছে বিশ্বমহলের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার। কারণ, অনেকে এটা আঞ্চলিক সমস্যা মনে করলেও আমরা মনে করি, এটা একটা বৈশ্বিক সমস্যা। আর যেহেতু, ইউরোপে আপাত দৃষ্টিতে সমস্যাটা প্রকট, তাই এ সমস্যার সমাধানে ইউরোপের রাষ্ট্রনেতাদের আরো আন্তরিক হওয়া উচিত। জাতিসংঘ, আইওএমের মতো শরণার্থী সংস্থাগুলো তাই বলছে, অভিবাসীদের বিষয়ে কঠোর নয় বরং আন্তরিক হওয়া উচিত। একটি কথা সবারই মনে রাখা উচিত, মানবতা বাঁচলে বাঁচবে মানুষ, বাঁচবে সভ্যতা।
সেদিন সাগরে আয়লান ভাসেনি ভেসেছে বিশ্বমানবতা। হাত ফসকে সে দিন ছোট্র শিশু আয়লান পড়েনি, পড়েছে মানবতাবাদীরা। অথৈ সমুদ্রে পড়েনি আয়লান, পড়েছে দেখো লেবানন, জর্ডান, তুর্কি-তুরস্ক, দুবাই, ওমান, কাতার, ইউরোপ সর্বোপরি বিশ্বের মানচিত্রে থাকা সবিশেষ সব দেশ।
পরিশেষে বলি যত হোক গালাগালি স্বার্থের চালাচালি ভিন্নমতের সংঘাত, সবাই মিলাও হাতে হাত মোরা মুহাম্মদের (সা.) উম্মাত।


Spread the love