ঠাকুরগাঁওয়ে আলোকিত সীমান্ত মাদক আর গরু চোরাচালানীরা আজ ঘামঝরানো শ্রমে

110
Spread the love

1201ঠাকুরগাঁও  প্রতিনিধি : যে গ্রামটিতে প্রতিদিন কেউ না কেউ আটক হত সীমান্তের ওপারে গরু আনতে গিয়ে , প্রাণঘাতি মাদক চোরাচালান ছিল যাদের জীবনে ‘নির্দোষ জীবন ধারণের উপায়’ , ভারতে গিয়ে বিএসএফ’র হাতে আটক হওয়া যাদের জন্য ছিল নিত্যদিনের ঘটনা সেই তারাই আজ আলো জ্বেলেছেন রত্নাই সীমান্তে। এখানকার এক সময়ের ‘শুটকা বস্তী’ আজ আত্মকর্মসংস্থান , চোরাচালান প্রতিরোধকারী ইতিবাচক শক্তিতে পরিণত হওয়ার দিকে দৃঢ় পদক্ষেপে এগোচ্ছে এক পা দু পা করে। আজ সেখানে চলছে ৩০ বিজিবি’র ‘আলোকিত সীমান্ত’ অনুযায়ী গরুর খামার, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, জৈব সার, মাশরুম চাষ, মধু চাষ, ফল ও ঔষধী গাছ উৎপাদন, সব্জী চাষসহ মানুষের আত্মমর্যাদার সাথে, শ্রম আর ঘাম ঝড়ানো স্বাভাবিক জীবনের দিকে ধাপিত করা নতুন প্রাণস্পন্দন।
স্বাভাবিক জীবিকার জন্য কোনো উপায় না থাকা, সামগ্রিক পরিবেশ ও নৈতিকতার অবক্ষয় এ এলাকায় সীমান্ত অপরাধের দিকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে এগিয়ে নেয়। সেখানেই ঠাকুরগাঁও সেক্টরের অধীন ৩০ বিজিবি’র অধিনায়কের প্রত্যক্ষ ততা্ববধানে রত্নাই সীমান্ত ফাঁড়ির জওয়ানদের সরাসরি অংশগ্রহণে শুরু হয় ‘আলোকিত সীমান্তের’ ৬টি প্রকল্প। গ্রামের মোট ৩৫ টি পরিবারের মধ্যে ২৩ টি পরিবার এই সমবায়ী উৎপাদন যজ্ঞে অংশ নিয়ে আলোকিত করছে এই জনপদ। প্রকল্পগুলো সফল করতে সম্পূরক কাজ হিসেবে ইপিলিপিল ঘাষ চাষ, শিশু পার্ক, টিউব ওয়েল স্থাপন, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের সক্রিয় ভূমিকায় ভূমিহীনদের মধ্যে খাস জমি বরাদ্দ-বিতরণ, বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন, এলজিইডি’র মাধ্যমে কাঁচা রাস্তা পাকাকরণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে । ইতোমধ্যেই চলছে এখানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তুলনামূলক বিশুদ্ধ ও যথাসম্ভব রাসয়নিক মুক্ত সব্জী চাষের প্রস্তুতি।
এই অপরাধপ্রবণ এলাকায় মানুষের নতুনভাবে বাঁচতে শেখার স্বপ্ন বিনির্মাণের প্রধান প্রাণপুরুষ ৩০ বিজিবি’র অধিনায়ক লে.কর্ণেল তুষার ইউনুস জানান , গত ১৯ নভেম্বর , ২০১৪ তারিখ বিকেল সাড়ে ছয়টায় এই গ্রামের শাহ আলম (২২) নামের এক যুবক ভারতে গরু আনতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে মারা যায়। এ ঘটনাই আমাদের ভাবায়, সীমান্ত পাহাড়া আমরা এখানে এখন যথেষ্ট জোরদার করেছি, প্রতিদিনই বিজিবি এখানে মাদকদ্রব্যসহ এ অপরাধে যুক্ত মানুষদের বিরূদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কিন্তু সেটাই কী যথেষ্ট ?
প্রত্যন্ত ও অনুন্নত এলাকায় মানুষ যাতে সৎভাবে কাজ করে জীবন ধারণ করতে পারে সে উপায়টিও তো তাকে দেয়া দরকার। আর তারই অংশ হিসেবে বিজিবি রংপুরস্থ উত্তর-পশ্চিম রিজিয়ন কমান্ডর দিকনির্দেশনায় ও ঠাকুরগাঁও সেক্টর কমান্ডার পরামর্শে আমরা এ উদ্যোগ গ্রহণ করি।
প্রকল্পের খুঁটিনাটি জানাতে গিয়ে প্রকল্পে অংশ নেয়া শেখ হাবিবুর রহমান বলেন, প্রকল্পের সদস্যের মধ্য থেকে ভাড়ার ভিত্তিতে যে জমি প্রদান করা হয়েছে, সেখানে ৬টি প্রকল্প ক্রমান্বয়ে চালু করা হয়েছে। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ৩ লাখ ১৫ হাজার, বেসরকারি সংস্থা ইএসডিও থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের নিকট থেকে অনুদান হিসেবে পাওয়া ২ লাখ সাড়ে ৯ হাজার এভাবে ৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকা প্রারম্ভিক পূঁজি হিসেবে ধরে এই প্রকল্প চালু করা হয়েছে। গরুর খামার, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, জৈব সার, মাশরুম চাষ, মধু চাষ, ফল ও ঔষধী গাছ উৎপাদন এই চারটি প্রকল্প থেকে প্রথম বছরই উপার্জন হবে প্রায় সোয়া চার লক্ষ টাকা বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ধারণাপত্রে উল্লেখ করা হয়। সাধারণ কৃষি উৎপাদনের তুলনায় এ আয় প্রায় ৫ গুণ বেশি বলে জানা যায়।
আরো বহুবিধ বেঁচে থাকার, এগিয়ে যাওয়ার আলোকিত লক্ষ্যের দিকে হাত বাড়িয়েছেন এই অন্ধকারের বাসিন্দারা। তারা শপথ নিয়েছেন , চোরাচালান আর না। সীমান্ত পার আর না। এখন মাটিতে বপন করা স্বপ্ন বলছে, আমাদের নতুন প্রজন্ম ভরে উঠবে সুশিক্ষার ফুলে ফলে। সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত করবার জন্য, শিশু পার্ক, আর স্কুল করার দিকে এগোচ্ছে হার না মানা মানুষরা। বায়োগ্যাসের মাধ্যমে শুরু হয়েছে বিদ্যুৎবিহীন জনপদে ঘরে ঘরে অনেক স্বল্প খরচে আলো বৈদ্যুতিক আলো জ্বালাবার ব্যবস্থা। এলাকাবাসী চাইছেন এই প্রদীপ যেন সব অপরাধ, সব অন্ধকারকে দূর করে দেশের সকল সীমান্তের অন্ধকার জীবনকে আলোকিত করবার পথ দেখায়।
প্রকল্পের অন্যতম সদস্য রানী বেগম বলেন, আমরা একা একা ঘরে অনেক আলোচনা আর লড়াই করতাম যাতে আমাদের স্মামীরা সীমান্তের ওপারে না যায়। তখন জোর ছিলনা আজ জোর পাচ্ছি। কেন আমরা বাঁচার পথ থাকতে মরতে যাবো?
বিএসএফ’র হাতে নিহত শাহ আলমের পিতা প্রকল্পের অন্যতম অনুপ্রেরণা গ্রামের মুরুবি্ব সের আলী বলেন, আমার ছেলের মত আর কাউকে যেন চোরচালানের ঘৃণ্য জীবন বেছে নিতে গিয়ে অপঘাতে মরতে না হয়।
আখতারা বেগম বলেন, এখানে নারী পুরুষ সবাই কাজ করছি, যে গাছ গাড়ছি তার ফুল ফল হতে দেখলে, ঘরে নতুন কারেন্টের আলোতে অনেক স্বপ্ন দেখি আমরা। আমরা অনেক খুশি। ২০ এপ্রিল ২০১৫ বিজিবি’র মহাপরিচালকের পক্ষে প্রকল্পটির উদ্বোধন করবেন বিজিবি উত্তর পশ্চিম রিজিওনের রিজিওন কমান্ডার (রংপুর) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহফুজুর রহমান।


Spread the love