তনুর বিচার দাবী ও অসামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম!

95
Spread the love

bdমাহবুবুর রহমান চৌধুরী : বর্তমান ডিজিটাল যুগে অতি মাত্রায় অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলো এক প্রকার অসামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিণত হয়েছে! বিশেষ করে ফেসবুকে কোন বাছ – বিচার , আইন , ধর্মীয় বিধি নিষেধ না মেনে আমরা যা করছি তা কতটুকু ন্যায় সংগত তা ভেবে দেখতে হবে না হলে একসময় পরিণাম হবে ভয়াবহ। উদাহরন হিসেবে সাম্প্রতি তনু হত্যার বিষয়টির প্রতি নজর দিলে তা বোধগম্য হবে বলে মনে করি। গত ২০ মার্চ রাত সোয় ১০টায় কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের মেধাবী ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু কতিপয় অজ্ঞাতনামা দুস্কৃতিকারীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে নির্মমভাবে খুন হন। এই ঘটনায় দোষীদের বিচার দাবী করে পরদিন থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে (ফেসবুকে ) তনুর কয়েকটি ছবি সহ বিচারের দাবী ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকেই তাদের পোষ্টে তনুর সংবাদটি আরো গুরুত্ব সহকারে তুলে না ধরায় প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়াকে দোষারোপ করতে থাকেন। সেনানিবাসের মতো সংরক্ষিত এলাকায় এই ঘটনা ঘটায় তা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে বিচারের দাবীতে তনুর যেসব ছবি ভাইরাল হয়েছে তার মধ্যে একটি ছবি আছে অর্ধনগ্ন রক্তাক্ত এক তরুণীর, এটি কেন বারবার শেযার করা হচ্ছে? বিচারের দাবীর নামে একজন মৃত ব্যক্তির অর্ধনগ্ন রক্তাক্ত ছবি জনসম্মুখে প্রকাশ করে আমরা কি সঠিক রুচির পরিচয় দিচ্ছি। একজন মুসলমান হিসেবে মৃত মানুষের এধরনের ছবি প্রকাশ কতটুকু নেকীর কাজ তা কি আমরা ভেবে দেখেছি। অন্যান্য ছবিতে তনুকে হিজাব পরিহিত অবস্থায় দেখা গেছে এমনকি কেউ কেউ হিজাবকে ইস্যু বানিয়ে পোস্ট করেছেন বিভিন্ন ধরনের মতামত। এই দেশ তনুদের জন্য নিরাপদ নয় বলে কেউ কেউ তনুকে নিজের বোন বানিয়ে তার কাছে ভাই হিসেবে ক্ষমা চেয়েছেন । নিঃসন্দেহে এই ক্ষমা চাওয়ায় আন্তরিকতার কোন ঘাটতি নেই কিন্তু সেই ভাইটি তার নিজের অলক্ষ্যে তার ধর্মীয় বোনের অর্ধনগ্ন রক্তাক্ত ছবি জনসম্মুখে প্রচার করে হিজাবের সম্মানইবা কোথায় রাখলেন, ভাই হিসেবে বোনের এসব ছবি কি প্রচার করা উচিৎ? এবার আসা যাক রক্তাক্ত ছবিটি আসলে কার এই বিষয়ে। আমার ক্ষুদ্র সাংবাদিকতা জ্ঞানের চর্চা করে রক্তাক্ত ছবিটি তনুর নয় বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে। ছবিটি যদি তনুর না হয় তা হলে অন্যের ছবি তনুর বলে চালিয়ে দেওয়া একটা অপরাধ অপরদিকে ছবিটি যারই হোকনা কেন এরকম ছবি প্রকাশ করাও একটা অপরাধ এতে জীবিত ও মৃত উভয়ের জন্যই গুনাহের কারন। সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী কোন ব্যাক্তির বিভৎস বা নগ্ন/ অর্ধনগ্ন ছবি প্রকাশে বিধি নিষেধ রয়েছে কিন্তু অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে এসব বিধি নিষেধ না থাকায় যার যা ইচ্ছা তাই প্রকাশ করে সামাজিক মাধ্যম গুলোকে অসামাজিক মাধ্যম করে তুলছেন। আজ ২৫ মার্চ দৈনিক প্রথম আলোর অনলাইনে প্রকাশিত একটি সংবাদে তনুর বাবা যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে তিনি বলেছেন “ রাত সোয়া দশটায় সাইকেলে করে বাসায় ফিরলাম। দেখি , তনুর মা মেঝেতে মন খারাপ করে বসে আছে। বলল , মেয়ে বাসায় ফেরেনি। আমার প্রতিবেশী ক্যান্টনমেন্ট বালক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিকদার কামাল। আমি বাসা থেকে বের হয়ে আগে তাঁকে বিষয়টি জানাই। এরপর টর্চলাইট নিয়ে মেয়ের খোঁজে বের হই। বেশি দূর যাইনি। বাসার কাছেই একটি কালভার্ট আছে। আমি কালভার্টের পাশে টর্চলাইটের আলো ফেললাম। দেখি আমার মেয়ের একটি জুতা পড়ে আছে। আমি চিৎকার দিয়ে কালভার্টের পাশের নিচের অংশে নেমে যাই। আমার গলা শুনে ছোট ছেলে রুবেল বাসা থেকে বেরিয়ে আসে। ১৫ থেকে ২০ গজ দূরে ওর মোবাইলটা পড়ে ছিল। আমি খুঁজতে খুঁজতে এগোই। একটু উঁচু জায়গায় জঙ্গল ও গাছগাছালির মধ্যে তনুকে পেলাম। গাছের তলায় ওর মাথা দক্ষিণ দিকে আর পা উত্তর দিকে পড়ে আছে। মাথার নিচটা থেঁতলে গেছে। পুরো মুখে রক্ত আর আঁচড়ের দাগ।” অর্থাৎ লাশটি রাতে এবং কোন একটা জঙ্গলে পাওয়া গেছে। আর ফেসবুকে যে ছবিটি ভাইরাল হয়েছে সেটি কোন একটি ঘরের ভেতের খাটের উপর কোন এক তরুনীর রক্তাক্ত ছবি। ছবির মেয়েটির পোশাক আর তনুর পোশাক পরনের স্টাইলও ভিন্ন । এই যখন অবস্থা তখন আমরা একে অপরের দেখা দেখি এসব কি করছি? ফেসবুকে কোন কিছু টাইমলাইনে আসলেই যে শেয়ার করতে হবে এরকমতো কোন আইন নেই। কি শেয়ার করবেন আর কি করবেননা তা নির্ভর করছে আপনার শিক্ষা, রুচি আর মানসিকতার উপর। এখনই এসব বিষয়ে যদি আমরা সতর্ক না হই তাহলে হয়তঃ দেখা যাবে আল্লাহ না করুন আমাদের কারো যদি অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় তাহরে অন্য কোন ব্যাক্তির ছবি আপনার আমার নামে চালিয়ে দেয়া হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের কিছুই করার থাকবেনা। আমি ব্যাক্তিগতভাবে কোন প্রকার বিকৃত ও প্রকাশ অযোগ্য ছবি প্রকাশ ছাড়াই সোহাগী জাহান তনু হত্যার বিচার দাবী করছি। লেখকঃ সভাপতি – গোলাপগঞ্জ সাংবাদিক কল্যাণ সমিতি

Spread the love