নারী ও শিশু পাচার রোধে ইসলাম

107
Spread the love

Md.Alamgir(1)মাওলানা মুহাম্মদ আলমগীর : ইসলাম মানবতার ধর্ম। মানুষের কল্যান সাধনই ইসলামের লক্ষ্য। এজন্য আল কুরআন ও সুন্নাহর সকল আলোচনা মানবকেন্দ্রিক। ইসলামী বিধি-বিধান সর্বকালের ও সর্বযুগের জন্য উপযোগী। এর সত্যতা ঘোষণা করে মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য একমাত্র জীবন বিধান হচ্ছে ইসলাম” (সূরা আলে ইমরান-১৯)।

তিনি আরো বলেন, “আমি তোমাদের জন্য জীবন বিধানের পূর্ণতা দান করলাম আর আমার নিয়ামতকে তোমাদের জন্য পরিপূণ করে দিলাম এবং ইসলামকে জীবন বিধান হিসাবে তোমাদের জন্য মনোনীত করলাম” (সূরা যায়েদা-৩)।

ইসলাম নারী ও শিশুকে যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করেছে। মা, স্ত্রী, বোন ও কন্যা এর যে কোন একটি পরিচয় হোক না কেন ইসলাম তাদের সকল অধিকার সংরক্ষণ করে। ইসলামে মা হিসাবে নারীর মর্যাদা সর্বাধিক। মহান আল্লাহ মায়ের মর্যাদা বর্ণনা করে বলেন, “আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে সীমাহীন কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তার দুধ ছাড়াতে সময় লেগেছে দুই বছর। অতএব আমার প্রতি ও তোমার মাতা-পিতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর” (সূরা লোকমান ১৪)। মায়ের মর্যাদা সম্পর্কে মহানবী (সঃ) হাদিস শরীফে বর্ননা করেন, জনৈক সাহাবী রাসুল (সঃ) এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল কে আমার কাছ থেকে উত্তম আচরন পাওয়ার অধিকারী, রাসুল (সাঃ) জবাব দিলেন “তোমার মা”। সাহাবী আবার জিজ্ঞাসা করলেন, তারপর কে এবার তিনি বললেন “তোমার মা”। সাহাবী আবার জিজ্ঞাসা করলেন তারপর কে? এবার তিনি বললেন “তোমার পিতা” (সহীহ্ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিম)। স্ত্রী হিসাবে নারীর মর্যাদা ইসলামে সুপ্রতিষ্ঠিত। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, তোমারা তোমাদের স্ত্রীদের সাথে ন্যায়সংগতভাবে জীবন যাপন কর। তিনি আরো বলেন, “তারা (স্ত্রীগণ) তোমাদের পরিচ্ছদস্বরূপ এবং তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) পরিচ্ছদ স্বরূপ (সূরা নিছা ১৯)।

শিশুর মর্যাদা ও অধিকার প্রদানে ইসলাম আপোষহীন। মহান আল্লাহ বলেন “তোমারা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করনা। তাদেরও তোমাদের রিযিক আমিই ব্যবস্থা করি (সূরা ইসরা)। আল্লাহর রাসুল বলেন “শিশুরা আল্লাহর ফুল, তাদেরকে ভালবাস (তিরমিযী)। আল্লাহর রাসুল আরো বলেন “যে ছোটদের øেহ করেনা এবং বড়দের সম্মান করেনা সে আমার উম্মত নয়” (বোখারী)।

কন্যা শিশুর মর্যাদা ও সম্মান আল্লাহর রাসুল আরো বেশী দিয়েছেন। শিশু ফাতেমাকে তিনি নিজ জীবনের চাইতেও ভালবাসতেন।

পাচার একটি জঘন্য জুলুম ও গুরুতর অপরাধ। নারী ও শিশু পাচার একটি জঘন্য অপরাধ। এটি একটি মহা অন্যায় কাজ। পৃথিবীর সকল আলেমের মতে এটা একটা হারাম কাজ। কোন মানুষের জন্য অন্য মানুষের সম্মান ও মর্যাদাহরণ করার সুযোগ নেই। এ সম্পর্কে রাসুল (সাঃ) বলেন “তোমাদের এ শহরে আজকের দিনও এ মাসের মতই তোমাদের একে অপরের জন্য তার জীবন সম্পদ ও সম্মান সম্মানীয়” (সহীহ্ বুখারী)। প্রত্যেক মানুষকে সম্মান ও মর্যাদার সাথে চলতে দিতে হবে। এটা তার অধিকার। পাচারের মাধ্যমে ব্যক্তির স্বাধীনভাবে চলার অধিকার হরণ করা হয়। তাছাড়া পাচারকারীরা মহিলা ও শিশুকে সাধারণ যেসব কাজে নিয়োজিত করে তাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে শরীয়তসম্মত নয়। তাই এ অপাধের সাথে জড়িত প্রায় সব দিকগুলোই হারাম ও অবৈধ। পাচার একটি প্রতারণা। ইসলামী আইনে সকল প্রকার প্রতারণা হারাম। প্রতারণা ও ধোঁকাবাজকে একটি শীর্ষস্থানীয় অপরাধ হিসাবে সাব্যস্থ করে আল্লাহ বলেন “আর এভবেই আমি প্রত্যেক জনপদে এর শীর্ষস্থানীয় অপরাধী লোকদেরকে এমনই করেছি, যেন তারা নিজেদের ধোকা, প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে” (সূরা আন্ আম- ১২৬)। রাসুল (সঃ) বলেন- “যে ব্যক্তি প্রতারণা করে সে আমাদের দলভূক্ত নয়” (সহীহ্ মুসলিম ১/৯৯)।

চুরির মাধ্যমে যখন পাচার করা হয় তখন সেটি আরেকটি হারাম কাজ। ইসলামের দৃষ্টিতে চুরি করা একটি বড় অপরাধ। তাই চোরকে আল্লাহ কঠিন শাস্তি দিতে নির্দেশ প্রদান করে বলেন, চোর পুরুষ হোক কিংবা নারী হোক তার কর্মফল হিসাবে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে লাঞ্চনা স্বরূপ। তাদের হাত কেটে দাও (সূরা আল মায়েদা, আয়াত-৪) রাসুল (সাঃ) বলেন “ঐ চোরের উপর আল্লাহর লানত যে সামান্য ডিম কিংবা রশি চুরি করতে করতে এমন চোরে পরিণত হয় যার ফলে তার হাত কর্তন করা হয়” (সহীহ্ বুখারী ৬/২৪৮৯)। আবার যখন অপহরণ করে পাচার করা হয় তখন তা আরেকটি অপরাধ তথা হারাম কাজ।

অপহরণ ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে একটি জঘন্য অপরাধ। তাই ইসলামে অপহরণের শাস্তি অত্যন্ত কঠিন। পাচারের ক্ষেত্রে সাধারণত চুরি ও প্রতারণা কে কৌশল হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে যে কৌশল অবলম্বন করা হোক না কেন সর্বাবস্থায় পাচারকে নিুবর্ণিত বিশেষণে বিশেষায়িত করা যায়।

১। এটি একটি জুলুম ও অন্যায় কাজ।

২। এটি একটি ফ্যাসাদ ও বিপর্যমূলক কাজ।

৩। এতে পাচারকারী নারী ও শিশুর জানমালের প্রতি চড়াও করা হয়ে থাকে।

৪। এটা অন্যকে কষ্ট দেওয়ার শামিল।

৫। এতে অন্যের প্রতি ক্ষতিসাধন করা হয়ে থাকে।

৬। পাচার মানবতা বিরোধী একটি গুরুতর অপরাধ।

৭। পাচার একটি অসামাজিক ও গর্হিত অপরাধ।

সাধারণত যেসব উদ্দেশ্যে নারী ও শিশুদেরকে পাচার করা হয় সেগুলোর বিরুদ্ধে ইসলামে কঠোর অবস্থান নারীদের ক্ষেত্রে ঃ

১। বিক্রির উদ্দেশ্যে (পতিতালয়ে কিংবা বিদেশী পর্যটকদের কাছে)।

২। সরাসরি দেহ ব্যবসায় নিযুক্ত করার উদ্দেশ্যে (পতিতালয়ে কিংবা ধনীদের রক্ষিতা হিসাবে)।

৩। পর্ণোগ্রাফি ছবি তৈরির জন্য

৪। মাদক দ্রব্যের ব্যবসা পরিচালনার জন্য

শিশুদের ক্ষেত্রে ঃ

১। নিঃসন্তান দম্পত্তির কাছে বিক্রয় করা।

২। হত্যা করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যক্ষ বিক্রি করা।

৩। বিকলাঙ্গ করে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করা।

৪। ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োগ করা।

৫। মাদক পাচার ও চোরাচালানী কাজে ব্যবহার করা।

৬। উঠের জকি হিসাবে ব্যবহার করা।

উল্লেখিত সব কাজ বিশেষ করে মানুষ বিক্রি করা, দেহ ব্যবসা, হত্যা, ভিক্ষাবত্তি, পর্ণোগ্রাফি ছবি তৈরি করা, অঙ্গহানী করা, মাদকদ্রব্য ও চোরাচালানী করা হারাম কাজ। এই হারাম পন্থায় অর্জিত অর্থ হালাল নয় হারাম। আজকে বাংলাদেশ শুধু নয় সারা পৃথিবী জুড়ে মানব পাচার একটি মারাত্মক ব্যধিতে পরিণত হয়েছে। এখনই এই মানব পাচার অপরাধ প্রতিরোধ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সমাজপতি, সাংবাদিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দসহ সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মানব পাচারের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করাও প্রতিরোধ করা সময়ের অপরিহার্য দাবী। ইসলামী নৈতিকতায় জনগণকে উজ্জিবিত করতে হবে। এক্ষেত্রে মসজিদের ইমাম, খতিব ও ইসলামী স্কলারগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। পাচার একটি নৈতিকতা বিরোধী হারাম কাজ। সুতরাং এর মাধ্যমে উপার্জিত সকল অর্থ ও হারাম। হারাম উপার্জনকারীর কোন আমলই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। হারাম ভক্ষণকারী সম্পর্কে রাসুল (সঃ) বলেন তার খাদ্য পানীয় এবং পোষাক-পরিচ্ছেদ সবই হারাম। কিভাবে তার দোয়া আল্লাহর নিকট কবুল হবে। রাসুল (সাঃ) আরো বলেন- “তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান কর রোগীর সেবাকর এবং বিনা বিচারে আটক বন্ধীদের মুক্ত কর”। তিনি আরো বলেন “ঐ ব্যক্তি উত্তম যিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করেন”। রাসুল (সাঃ) বলেন “তোমরা জমিনবাসীর প্রতি করুণাশীল হওয় তবে আসমানের মালিক তোমাদের প্রতি করুণাশীল হবেন” (জামে তিরমিযী)। তিনি আরো বলেন “যে ব্যক্তি পৃথিবীতে কোন মুমিনের বিপদ দূর করতে সহায়তা করে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার বিদপ দূর করে দিবেন” (সহীহ্ মুসলিম। এ সব আয়াত ও হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, পাচারের মাধ্যমে নির্যাতিত ব্যক্তিদের। নারী ও শিশুদের রক্ষায় আত্ম নিয়োগ করা প্রতিটি মুসলমানের উপর অবশ্য করুনীয়। অসহায় নারী, পুরুষ ও শিশুদের পাশে দাঁড়াবার নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন- “তোমাদের কি হল যে, তোমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করছনা? অথচ দুর্বল নারী, পুরুষ ও শিশুরা চিৎকার দিয়ে বলছে যে, হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে জালিমের জনপদ থেকে উদ্ধার করুন। আপনি আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে বন্ধু ও সাহায্যকারী পাঠান” (সূরা নেছা)

সম্মানিত পাঠক/ পাঠিকা বন্ধুগণ নারী ও শিশু পাচার একটি গুরুতর অপরাধ। আধুনিক পৃথিবীর বহুদেশে এই বর্বরতা ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করছে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণ পেতে রাষ্ট্র, সরকার, সমাজের সকল স্তরের সচেতন ব্যক্তিদেরকে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। ইসলামী স্কলারগণ জুমার খোতবায়, ওয়াজ ও দোয়া মাহফিল, বিয়ে এবং ক্লাসে আলোচনার মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করতে পারেন। আল্লাহপাক আমাদের মানব পাচারের মত ভয়াবহ দূর্যোগ প্রতিরোধের তৌফিক দান করুন, আমীন।


Spread the love