পিরোজপুরের নদী ভাঙ্গনে হুমকির মুখে বিস্তীর্ণ জনপদ

82
Spread the love

hgসৈয়দ মাহ্ফুজ রহমান, পিরোজপুর : পিরোজপুর জেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বলেশ্বর, সন্ধ্যা, কঁচা, তালতলা, কালিগঙ্গা, মধুমতি ও পোনা নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে ৭ উপজেলার ১৮টি বন্দর ও ৭৫টি গ্রামসহ বিস্তীর্ণ জনপদ হুমকির সম্মুখীন। নদীর ভাঙ্গনের তাণ্ডব ঠেকাতে ব্যর্থ হলে দেশের মানচিত্র থেকে দ্বীপ জেলা পিরোজপুরের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তীব্র স্রোতে ভাঙ্গন কবলে প্রায় ২শ ৫৮ কি.মি.। সাগর উপকূলীয় জেলা পিরোজপুরের প্রায় ১৩ লাখ মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করেই বসবাস করতে হচ্ছে। বার বার প্রকৃতির নির্মম আঘাতে বসতবাড়ি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, মসজিদ, মন্দির ও ফসলী জমি তলিয়ে যাচ্ছে নদী গর্ভে। বসত ভিটা হারিয়ে নিঃশ্ব হচ্ছে সহস্রাধিক পরিবার।

দীর্ঘ যুগের বিরতিহীন ভাঙ্গনের তাণ্ডব লীলায় উপকূলীয় উপজেলা নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) সন্ধ্যা নদীর প্রায় দুইযুগ ধরে ভাঙন অব্যাহত থাকায় পাল্টে যাচ্ছে উপজেলার ১২টি গ্রামের মানচিত্র। সন্ধ্যার কড়াল গ্রাসে দক্ষিণ কৌরিখাড়া, সোহাগদল, গনমান, মুনিনাগ, জলাবাড়ী, উত্তর কৌরিখাড়া, বারড়া, শান্তিহার, ছারছীনা, কুনিয়ারী গ্রামের বাসিন্দারা বসত ভিটায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। গত ২৭ ও ২৮ মে (সোম- মঙ্গলবার) দুই দিনে সন্ধ্যা নদীর আকস্মিক ভাঙনে দক্ষিণ কৌরিখাড়া লঞ্চঘাট সংলগ্ন ৭টি দোকান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে আর ভাঙন কবলিত এলাকায় দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। সাম্প্রতিককালে গনমান গ্রামের পল্লী সল্ট ইন্ডাষ্ট্রিজ, ৪টি বসতঘরসহ প্রায় ১ একর ফসলী জমি সন্ধ্যানদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বিগত কয়েক বছর ধরে দফায় দফায় ভাঙনের ফলে ওই সব গ্রামের শতশত পরিবার বসত-ভিটা হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার গর্ভে হারিয়ে গেছে হাজার হাজার একর ফসলী জমিসহ বিস্তীর্ণ জনপদ। পৈত্রিক ভিটা মাটি হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব ও অসহায় হয়ে পড়েছে। ভাঙন কবলিত এলাকায় এখনও অনেক পরিবার তাদের বসত ভিটার শেষ আশ্রয়স্থলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। স্বরূপকাঠিÑপিরোজপুর সড়কের কামারকাঠি নামক স্থানে নদী ভাঙনের ফলে চরম ঝুঁকির নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন।
এদিকে, ভাণ্ডারিয়ায় গত তিন বছর পূর্বে তেলিখালী বাজারের ১২টি দোকান ও বৈদ্যুতিক খুটিসহ ২ একর জমি কঁচা নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ক্ষতির আশঙ্কায় সে সময় ওই বাজার থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেয় অনেক ব্যবসায়ী। জেলার নদীপথের প্রবেশদ্বার হুলারহাট নৌ-বন্দর কালিগঙ্গা ও কঁচা নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে অস্তিত্ব বিলীন প্রায়। এছাড়া পিরোজপুর সদর উপজেলা শংকরপাশা ইউনিয়নের কঁচা নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে পীর হাবিবুর রহমান এর বাড়ির মসজিদ, বসত ঘর, গাজিপুর নেছারিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার বিভিন্ন অংশসহ একাধিক গ্রাম এখন হুমকির মুখে। অপরদিকে জেলা শহরের তীব্র ভাঙ্গনে চাঁদমারি, বলেশ্বর ব্রীজ, পুরাতন ফেরিঘাট এলাকা হুমকির সম্মুখীন।
উপকূলীয় উপজেলা জিয়ানগরের কচা ও বলেশ্বর নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে চারাখালী খাদ্য গুদাম, গুচ্ছ গ্রামসহ একাধিক গ্রাম এখন হুমকির মুখে। ওই গ্রামের বাসিন্দারা জানান, আমাদের পৈত্রিক ভিটা-বাড়ীসহ শতাধিক বাড়ী ও প্রায় ৪ শত বিঘা ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া উপজেলার টগড়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী বৃটিশ আমলের জামে মসজিদসহ শতাধিক বাড়ী ইতোমধ্যে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বালিপাড়া ইউনিয়নের চন্ডিপুর ও খোলপুটয়া গ্রামের কঁচা ও বলেশ্বর নদীর ভাঙ্গনে ভিটা-বাড়ীসহ কৃষি জমি নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া, চারাখালী গ্রামের খাদ্য গুদাম, গুচ্ছ গ্রাম, ভাড়ানী খালের স্লুইচ গেইটের ২ পাশের রাস্তা বলেশ্বর নদীতে ভেঙ্গে পড়ছে। পানী উন্নয়ন বোর্ড ভাঙ্গন রোধে কোন উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহন না করায় এলাকাবাসীর ফসলী জমি, বসত বাড়ি হারিয়ে তাদের পথে বসার উপক্রম।
পিরোজপুর জেলার উত্তরের জনপদ নাজিরপুর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ¯্রােতস্বীনি মধুমতি গ্রাস করেছে মাটিভাঙ্গা ও শ্রীরামকাঠি বন্দরকে। এছাড়া তালতলা ও কালিগঙ্গা নদীর করাল গ্রাসে শাখারাকাঠী, মালিখালি ও দীর্ঘা গ্রামের বাজার, স্কুল, মসজিদ, মন্দির, রাস্তাঘাট ভেঙ্গে যাচ্ছে। মধুমতি নদীর ভাঙ্গনে একই উপজেলার মিঠাকুল ঝনঝনিয়া, চাঁপাখালি, সাচিয়া ও লড়া গ্রামে দুশতাধিক লোকের বসতবাড়িসহ আবাদী জমি, মাদ্রাসা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। তাছাড়া উপজেলার তালতলা নদীর তীব্র ভাঙ্গনের কবলে হোগলাবুনিয়াসহ আরো অর্ধশত গ্রামের শতাধিক পরিবার এখন গৃহহারা।
সন্ধ্যা নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে স্বরূপকাঠি ও কাউখালী উপজেলার মাঝদিয়ে বয়ে যাওয়া সন্ধ্যা নদীর ভাঙ্গনে ভিটেমাটি ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে হাজার হাজার পরিবার। ভাঙ্গনের ফলে স্বরূপকাঠি-বরিশাল সড়ক এখন মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। তিন যুগর অধিক সময় ধরে নদী ভাঙ্গন শুরু হলেও এ বছর ভাঙ্গনের তীব্রতা বেশী। বর্তমানে নেছারাবাদ ছারছিনা পীর সাহেবের বাড়ি, দরবার শরীফ, মাদ্রাসা ও এতিমখানাসহ কাউখালী বন্দর রয়েছে হুমকির মুখে। কাউখালী আশোয়া গ্রামের দুই পাশদিয়ে বয়ে যাওয়া প্রমত্তা কঁচা ও গাবখান নদী। যৌথ নদীর মাঝখানে অবস্থিত আমরজুড়ি ইউনিয়নের প্রায় ৮ হাজার জনবসতি যারা অধিকাংশ মানুষই হিন্দু সম্প্রদায়ের।
মঠবাড়িয়া উপজেলা তুষখালী ও শাফা বন্দর দুটিও বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তীব্র ভাঙ্গনের ফলে তুষখালী লঞ্চঘাট এলাকা অনেকাংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। অবিরাম ভাঙ্গনে বন্দরের বহু দোকান ও বসতবাড়ি নদী গর্ভে নিমজ্জিত হয়েছে। ইতোমধ্যে উপজেলার বড়মাছুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝঁকির মধ্যে রয়েছে সেখানকার স্ট্রিমার ঘাটটিও। ২০০৮ সালের ২৫ মে প্রকৃতির ভয়াবহ জলোচ্ছাস তাণ্ডবে লণ্ড-ভণ্ড করে দেয় বেড়ীবাঁধ, ব্রীজ-কালভার্ট, রাস্তাঘাটসহ হাজার হাজার একর ফসলী জমি। ফলে অরক্ষিত ও নিঃশ্ব হয়ে পরে উপকূলের লক্ষ লক্ষ মানুষ।
এদিকে, প্রকৃতির রুদ্র হামলার শিকার ভান্ডারিয়া-চরখালি-পিরোজপুর সড়ক হুমকির সম্মুখিন। প্রবল বৃষ্টিপাতে ও জোয়ারের প্রচন্ড চাপে ভান্ডারিয়ার তেলিখালি, মঠবাড়িয়া খেতাচিড়া ও ভোলমারা, জিয়ানগরের টগড়া ও সাউথখালি এবং সদর উপজেলার শারিকতলা এলাকায় কমপক্ষে ৮টি স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। আইলার পাঁচ বছরেও পিরোজপুর জেলার বিধ্বস্থ বাধঁগুলো এখনও সংস্কারবিহীন থাকায় উদ্বিগ্ন জেলাবাসী।
পিরোজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানাযায়, জেলায় মোট বেড়ীবাঁধের পরিমান ২শ ৫৮কিঃ মিঃ। ঘূর্নিঝড় সিডর ও পরবর্তী আইলার জলোচ্ছ্বাসে জেলার জিয়ানগর, পিরোজপুর সদর, মঠবাড়িয়া ও ভাণ্ডারিয়া উপজেলায় বিধ্বস্থ ১ শ ১১ কিঃমিঃ বেড়ীবাঁধের জন্য সরকারীভাবে এ পর্যন্ত মাত্র ৩ হাজার মেঃটঃ গম বরাদ্দ পাওয়া গেছে। যা দিয়ে মাত্র ১৮ কিঃ মিঃ বাঁধ মেরামত করা সম্ভব হয়েছে। অবশিষ্ট বাঁধ এখন সম্পূর্ন অরক্ষিত। এ সময় ৩০টি স্লুইস গেট সম্পূর্ণ ও ৪৩ টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এছাড়া আরও ৫শ ২০মিটার এলাকার তীর সংরক্ষণ সিসি ব্লক নদীতে ভেসে যায়, কো¬জার নষ্ঠ হয় ১৭টি। বিধ্বস্থ পিরোজপুরের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে সে সময় বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধিরা বেড়ীবাঁধের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমান নির্ণয় করে ছিল ২ হাজার ১শ ৫০ কোটি টাকা। তবে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা তখন জানিয়েছিল, বেড়ীবাঁধ নির্মানেই কেবল প্রয়োজন ১৭ কোটি টাকা। আইলা ও সিডরের পর ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ ও অন্যান্য স্থাপনা মেরামত ও সংস্কারের জন্য কর্তৃপক্ষ ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়ে প্রস্তাব পাঠালেও তা এখনও অন্ধকারেই রয়ে গেছে বলে সূত্র জানায়। এদিকে, ভাঙ্গন তান্ডব বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এসব ইউনিয়নের স্থায়িত্ব নিয়ে হিসাব নিকাশ শুরু হয়ে গেছে।
জেলার ভাঙ্গনে জনপদগুলোর করুণ চিত্র দেখে মনে হয় আগামী ১০ বছরের মধ্যে জেলার মানচিত্র পাল্টে যাবে। ভাঙ্গন রোধকল্পে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিটি সরকারের আমলেই প্রতিশ্র“তি দেওয়া হলেও শুধু ঘোষণায়ই থেকে যায়, বাস্তবায়িত হয় না।
পিরোজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী উজ্জ্বল সেন সাংবাদিকদের বলেন, আমি সন্ধ্যার কড়ালগ্রাসে দক্ষিণ কৌরিখাড়া লঞ্চঘাট এলাকায় নদী ভাঙনের কথা শুনেছি। সন্ধ্যা নদীর ভাঙন রোধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃক্ষের কাছে কারিগরি প্রতিবেদন পাঠানো হবে।

Spread the love