ফুলবাড়ীতে কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য জাতা

113
Spread the love

fমোস্তাফিজুর রহমান সুমন, ফুলবাড়ী, দিনাজপুর : আধুনিক যন্ত্রপাতির আদলে মানুষের জীবন যাত্রা বদলে যাচ্ছে। সেই সাথে ফুলবাড়ীতে কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য জাতা। ফুলবাড়ীতে বিভিন্ন গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ীতে এক সময় দেখা যেত জাতা। বিয়ের সময় অনেকে বাবার বাড়ী হতে নব বধূ উপহার হিসেবে পেত এই জাতা। এই কিছু কাল আগেও জাতা মহিলাদের কাছে খুব প্রয়োজনীয় একটি গৃহস্থলি উপকরণ ছিল। কিন্তু সময়ের কাছে এবং আধুনিক যন্ত্রের কাছে মার খেয়ে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এই জাতা দিয়ে গ্রাম বাংলার বধূরা এই কিছুদিন আগেও চাল,গম হতে আটা-ময়দা করতে ব্যবহার করত (যদিও ঢেঁকির সাহায্যে তা করা হত, তবে অল্প পরিমাণে আটা করতে জাতা ব্যবহার করা হত)। এ ছাড়া যাতা দিয়ে ভাঙ্গানো হতো মশারী, খেসারী, মাশ কলাইসহ প্রভৃতি রকমের ডাল। জাতা তৈরির মূল উপাদান পাথর। মসৃণ দুই খন্ড পাথরকে কেটে গোল করে জাতা তৈরি করা হত। সেই খণ্ড দুটির ভেতরের ভাগ(যে দিক বা পাশ ভিতরের দিকে থাকবে) কে লোহার তৈরি বিশেষ বাটাল বা যন্ত্র দিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চটলা বা খাল করে এর ধার বাড়ানো হয় এবং উপরে এবং নিচের পাটের মাঝে গোল একটি ছিদ্র করা হয়। যা দিয়ে বিশেষ ভাবে কাঠের বা বাশ দিয়ে তৈরি হাতল লাগানো হয় যা দুই পাটকে এক জায়গায় থাকতে সাহায্য করে। দুই ছিদ্রের মাঝে বিশেষ খাজ কাটা দণ্ড থাকে যার সাহায্যে পাট দুটির মাঝে কতটুকু ফাঁক থাকবে তা নির্ধারণ করা হয় অর্থাৎ আপনি কেমন আটা বা ডালের টুকরা চান তার উপর নির্ভর করে পাট দুটির মাঝে ফাঁক রাখা হয় ঐ ডন্ডের মাধ্যমে। শুধু উপরের পাটে আর একটি ফুটো করা হয় যা দিয়ে শস্য কে ভিতরে পাঠানো হয় পিষার জন্য। গৃহবধূরা মাঝের ফুটো হাতল ধরে আরেকটি ফুটো দিয়ে শস্য ভিতরে দিয়ে হাতল ধরে জোরে ঘুরাতে থাকে । এতে শুধু উপরের পাট নিচের পাটের উপর ঘুরতে থাকে এবং দুই পাটের ঘর্ষণের ফলে উপর হতে দেওয়া শস্য ভেঙ্গে গুড়া হয়ে দুই পাটের চার সাইড ফাক দিয়ে দ্রুত গতিতে বের হয়ে আসে। অনেক সময় দেখা যায় ভাল করে গুড়া হয় না। ফলে আবার সেগুলিকে ভিতরে দিয়ে আবার জাতা ঘুরিয়ে ভাল করে গুড়া করা হয়। দুই পাটের মাঝে থাকা খাজ কাটা ডন্ডের মাধ্যমে দু পাটের ফাঁক কম বেশি করে সশ্যের আটা বা ডালের টুকরা কেমন হবে তা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। পাথরের তৈরী যাতা দিয়ে যখন কাজ করা হয় তখন একটি মিষ্টি ধরনের শব্দ হয়। এখন আর চোখে পড়ে না সচারাচার জাতার ব্যবহার। উন্নত ধরনের মেশিন তৈরী হওয়ার কারনে সুখ প্রিয় বাঙ্গালী পরিবার আর কষ্ট করে জাতা চালাতে চায় না। তারপরও ফুলবাড়ীর গ্রামাঞ্চলের অনেক পরিবার হয়তো জাতাকে ঐতিহ্য হিসাবে ধরে রেখেছেন। আমাদের বাড়িতে এখনো আছে পাথরের জাতা কিন্তু তা আর ব্যবহার হয়না। হয়ত আর কিছু দিন পর এ জাতা কালের আবর্তে হারিয়ে যাবে।


Spread the love