বগুড়ায় চোর সন্দেহে শিশু শিক্ষার্থীকে গাছের সাথে বেঁধে নির্যাতন

62
Spread the love

image_2086_263870বগুড়া প্রতিনিধি : রাবি্বর শরীরে জখমের চিহ্ন। প্রচন্ড ব্যথা। ফ্যাকাশে চোখ-মুখে আতঙ্কের ছাপ। জ্বরে কাতরাচ্ছে। সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন বেগম খাতুন। এখন কেমন আছে রাবি্ব, জানতে চাইলে মা বেগম খাতুন কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। তার চোখ বেয়ে পড়ে লোনা জল। আঁচলে মুছে নেন চোখ। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। একটু দম নেন। সন্তানের মুখের দিকে বার বার ফিরে তাকান। এরপর আবেগাপ্লুত হয়ে বলতে থাকেন, চোর সন্দেহে রাবি্বকে নির্যাতনের লোমহর্ষ কাহিনী।
রাবি্ব মিয়া। বয়স অনুমান আট বছর। বাড়ি বগুড়ার ধুনট উপজেলার মানিকপোটল গ্রামে। বাবার নাম লাল মিয়া। মা বেগম খাতুন। রাবি্ব মরিচতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী। রাবি্বর বাবা স’ মিলের শ্রমিক। মা গৃহকর্মীর কাজ করেন। মা-বাবা লেখাপড়া জানেন না। কিন্ত লেখাপড়ার মর্ম তারা বোঝেন। তাই একমাত্র ছেলে রাবি্বকে স্কুলে ভর্তি করান মা-বাবা।
ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সন্তানের পাশে বসে মা বেগম খাতুন বলেন, গত সকাল ৯টার দিকে স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয় রাবি্ব। বাড়ি থেকে স্কুলে পৌছতে সময় লাগে কমপক্ষে ১০ মিনিট। পথিমধ্যে মানিকপোটল গ্রামের কোরবান আলীর (জনশূন্য) বাড়ির ওপর দিয়ে যাচ্ছিল রাবি্ব। এসময় কোরবান আলীর প্রতিবেশী মিষ্টি ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান রাবি্বকে চোর সন্দেহ করে। রাবি্ব কোরবান আলীর বাড়ির ভিতর চুরির উদ্দেশ্যে ঢুকেছিল। এমন অভিযোগ এনে রাবি্বর বুকে আগলে রাখা বই-খাতা ছিঁড়ে ফেলে দেয়। তারপর এলোপাতাড়ি চড়থাপ্পড় মারতে থাকে। রাবি্বর চিৎকারে একই গ্রামের আল আমিন, মিনার উদ্দিন, হিমেল মিয়া ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। খলিলুর রহমানের কথায় বিশ্বাস করে তারা রাবি্বকে চোর সাব্যস্ত করে। অন্যদের সহায়তায় খলিলুর রহমান রশি দিয়ে শিশু রাবি্বর হাত-পা গাছের সাথে বাঁধে। এরপর বাঁশের কঞ্চি দিয়ে পালাক্রমে পেটাতে থাকে। তখন রাবি্ব বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করে। রাবি্বর এই চিৎকার যেন কেউ শুনতে না পায়, এ জন্য গলায় রশি ও মুখ গামছা দিয়ে বাঁধা হয়। ধীরে ধীরে নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়ে রাবি্ব। তখন সহপাঠীরা নির্যাতনের এই চিত্র দেখে রাবি্বর মাকে খবর দেয়। মা বেগম খাতুন ঘটনাস্থলে ছুটে এসে সন্তানকে ছেড়ে নেয়ার জন্য নির্যাতনকারীদের কাছে আকুতি জানান। কিন্তু রাবি্বর মায়ের কান্নায় হৃদয় গলেনি নির্যাতনকারীদের। দুপুর ২টার দিকে স্থানীয় গ্রাম পুলিশ আবুল কাসেম এ বিষয়টি ধুনট থানা পুলিশকে অবহিত করেন। পরে থানার এসআই রফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে পেঁৗছে রাবি্বকে উদ্ধারের পর বিকাল ৪টার দিকে ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এ বিষয়ে ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান বলেন, রাবি্ব আমার প্রতিবেশীর বাড়িতে প্রবেশ করে চুরির চেষ্টা চালায়। এসময় আমি সেখান দিয়ে যাওয়ার পথে রাবি্বকে আটক করি। পরে গ্রামের লোকজন রাবি্বকে দড়ি দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে। এর আগে আমার দোকানে কয়েক বার চুরি হয়েছে। সেই চুরির বিষয়ে রাবি্বকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ ঘটনায় তাকে কোন প্রকার নির্যাতন করা হয়নি। ধুনট থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) পঞ্চনন্দ সরকার বলেন, স্থানীয় গ্রাম পুলিশের সংবাদের ভিত্তিতে ঘটনাস্থল থেকে রাবি্বকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তবে নির্যাতিত শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ থানায় অভিযোগ দায়ের করেনি। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে।


Spread the love