বীর চট্টলার কিংবদন্তি মিয়া আবু মোহাম্মদ ফারুকী

88
Spread the love

সাফাত বিন ছানাউল্লাহ্ : ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব হয় যারা এই পৃথিবীতে নিজ কর্মে গুণান্বিত হয়ে স্বরনীয় বরণীয় হয়ে থাকেন। শারীরিক ভাবে চিরকাল ওরা পৃথিবীতে না থাকলেও তাদের বিশাল কর্মময় স্বৃতিগুলো রয়ে যায় আজীবন ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে। খ্যাতিমানদের যুগে যুগে মানুষ স্মরণ করেন, রেখে যাওয়া কর্মগুলো থেকেই নব প্রজন্ম আগামীর চলার পথে সুন্দর জীবন গঠনের উৎসাহ খুঁজে।

তেমনি একজন কালজয়ী মহাপুরুষ চট্টগ্রাম তথা সারা বাংলাদেশের সৎ ও ত্যাগী রাজনীতিবিদ হিসেবে খ্যাত, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংঘটক, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা, অবিভক্ত চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক প্রচার ও দপ্তর সম্পাদক মরহুম মিয়া আবু মোহাম্মদ ফারুকী। আমি নিজেকে নিয়ে গর্বিত তিনি আমার প্রিয় নানাভাই। আজ তিনি পৃথিবীতে নেই! সৃষ্টিকর্তার ডাকে তিনি পরপারের বাসিন্দা হয়েছেন ২০১৬ সালের ১ জুলাই।
১৯৩৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি ইতিহাসখ্যাত ব্যক্তিত্বদের বিপ্লবতীর্থ ভূমি বীর প্রসবিনী পটিয়ার ফারুকী পাড়াতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামী মাওলানা খলিলুর রহমান ফারুকী। তিনি ছিলেন চট্টল গৌরব, উপমহাদেশ খ্যাত রাজনীতিবিদ, সাংবাদিকতার পথিকৃৎ, গ্রন্থ প্রণেতা ও ইসলামী চিন্তাবিদ, নিখিল ভারত কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্য মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী।  ছোটবেলায় পিতার হাত ধরে মিঞা ফারুকী বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যেতেন এবং খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বদের বক্তব্য খুব কাছ থেকে শোনার সুযোগ হয়েছে। মূলত পিতার অনুপ্রেরণায় তাঁর রাজনীতির মাটে আগমন।
প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেড়িয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পড়া অবস্থায় বাংলাদেশ আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠালগ্ন ১৯৪৯ সালে মিয়া ফারুকী পটিয়ার স্থানীয় কমিটিতে যোগ দেন। পরে দলের সদস্য থেকে সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬০ সালে অবিভক্ত চট্টগ্রাম জিলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও ১৯৬৯ সালে দপ্তর সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু তাঁকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর নিযুক্ত করেন। ১৯৫৮ সালে রাজনীতির উত্তাল আন্দোলনের সময় তৎকালিন সরকারের পুলিশ বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে ১ মাস ১৩ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৬৬ র ছয়দফা আন্দোলনের হরতালের সময়ও গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে আরো ৩-৪ বার তাঁকে জেলে যেতে হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে।
মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ ছাড়িয়ে তিনি ছিলেন নামকরা লেখক কলামিস্ট ও সাহিত্যিক। চট্টগ্রামের স্থানীয় পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিন ছাড়াও তিনি লিখতেন দেশের নামকরা পত্রিকা ও ম্যাগাজিনগুলোতে। দেশের যেকোনো সংকট, নষ্ট রাজনীতি, চট্টগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন নান্দনিক সৌন্দর্য ওনার লেখায় ফুটে উটতো অত্যন্ত নিপুণভাবে।  বিশ্ব রাজনীতি ও আন্তর্যাতিক যেকোনো পরিস্থিতি নিয়েও তিনি সাহসিকতার সাথে কলমযুদ্ধ চালিয়ে যেতেন।
“যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বলিয়া মিথ্যা বলিবনা” এই কথাটি পবিত্র আদালতের এজলাশে দাড়িয়ে বাদী এবং বিবাদীর জবানবন্দি। কিন্তু, সত্যি কথা কয়জনই বলেন। চারদিকে এখন মিথ্যের কারখানা। মিডিয়া, অফিস, পত্রিকা, রাস্তাঘাট যেখানে আপনি খুব বেশী মিথ্যে বলতে পারবেন আপনার মর্যাদাও বাড়বে এই নষ্ট সমাজে।  পত্র-পত্রিকার কলামপাতা যখন পড়ি অনুধাবন করতে পারি কলামিস্টরাও আজ অর্থলোভী হয়ে অন্যের গুণগানে মুখর থাকেন। বাংলাদেশে অনেক স্বনামধন্য কলামিস্ট আছেন তাদের মধ্যে একেবারে ব্যতিক্রম ছিলেন তিনি। চট্টগ্রামের অন্যতম পাঠকপ্রিয় দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চে ওনার প্রতি সপ্তাহে ” নির্বাক উক্তি ” শিরোনামের কলামগুলো বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ১৯৭৫ এর কালরাত্রিতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহীদ হওয়ার পর বিভিন্ন পটপরিবর্তনের ফলে নোংরা রাজনীতি থেকে দুরে থাকলেও লেখালেখির মাধ্যমে অবিরাম কলম বর্ষণ করে তিনি শুদ্ধ রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।
বীর চট্টলার এই কিংবদন্তীতুল্য মহাপুরুষ রাজনীতি, লেখালেখি ও সমাজকর্মের জন্য বহু পুরস্কার, স্বর্ণপদক পেলেও জীবদ্দশায় পাননি কোন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা।
অথচ আজ অনেকে মুক্তিযুদ্ধের সময় জন্মগ্রহণ না করেও মুক্তিযোদ্ধার খাতায় নাম লেখাচ্ছেন, রাষ্ট্রের নানা সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন।  মিয়া ফারুকীরা তো জীবনে কিছুই চায়নি। ওরা তো অস্ত্র হাতে নিয়েছিল দেশকে শত্রুমুক্ত করবে বলে। শেষ সময়গুলোতে তিনি কাটাতেন অত্যন্ত নিরবে নিভৃতে নিজ গ্রাম পটিয়ার ফারুকী পাড়ার বাড়ীতে। তিনি যদি চাইতেন পারতেন নোংরা রাজনীতি করে প্রচুর কালো টাকা বানিয়ে বিশাল দালান গড়তে।  অথচ, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাঞ্জাবীরা পুড়িয়ে দেয়ার পর যে ঘরটি করেছিলেন তাতেই বসবাসে অভ্যস্ত ছিলেন আজীবন।  সেই ঘরের ওনার কক্ষে বিশাল লাইব্রেরী বিভিন্ন সময় পাওয়া স্বীকৃতির সম্মাননা আর নিজের লেখাগুলো যে পত্র-পত্রিকা ম্যাগাজিন গুলোতে ছাপা হয়েছিল সেগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন তিনি।  লেখাগুলোকে তিনি নিজ পুত্রের থেকেও বেশী যত্ন করতেন, কোন পোকা যাতে আক্রমন করতে না পারে।  বিছানায় বসেই লিখতেন আর ছোটমামা (শহীদ ফারুকী) কে দিয়ে ডাকযোগে
পত্রিকা/ম্যাগাজিন অফিসে পাঠাতেন।  মাঝে মধ্যে ওনার রাজনৈতিক সহকর্মীরা ফোন করে খোঁজখবর নিতেন দুই একজন বন্ধু/সহকর্মী মাঝেমধ্যে বাড়ীতে দেখতে আসতেন। তবে জাতীয় নেতৃবৃন্দ- যাদের সাথে একসময় রাজনীতি-মুক্তিযুদ্ধ করেছেন ওরা খবর না নেয়ায় আক্ষেপ করেছিলেন শয্যাশায়ী অবস্থায়ও।
একটা সময় ছিল যখন তিনি দেশমাতৃকার টানে চষে বেড়িয়েছেন টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া। সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু, একজন তরুণ ভাষাসৈনিক হিসেবে মাতৃভাষা বাংলার মান রক্ষার্থে আন্দোলন করেছেন তৎকালিন চট্টগ্রামের প্রখ্যাত ভাষাসৈনিকদের সঙ্গে। সহ্য করেছিলেন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠের নির্মম অত্যাচার।

১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন – ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে তৎকালীন শাসক গোষ্ঠীর লেলিয়ে দেয়া হিংস্র পুলিশ গুলি চালিয়ে অসংখ্য হত্যার ঘটনা মহকুমা পটিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে বিকালেই রাজপথে নেমে আসে সর্বস্তরের ছাত্রজনতা। তারা এ সময় রাস্তায় শুয়ে সড়ক ও রেলপথ বন্ধ করে দেয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলোপাতাড়ি লাঠিচার্জ করে আমাদের উপর। প্রতিবাদে স্কুল-কলেজের ছাত্র, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এক মঞ্চে চলে আসেন। তারা স্লোগান দিয়ে পটিয়ার মোজাফফরাবাদ থেকে মিলিটারি পুল পর্যন্ত রাস্তায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তখন আমার বয়স ২২। আমার সাথে আন্দোলনে সহযোদ্ধা ছিলেন, একে এম আবদুল মান্নান, পুলিন কানুনগো, নুরুল ইসলাম সহ আরো অনেকে। আন্দোলনের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজো চোখে অশ্রু এসে যায়।

(সাক্ষাৎকার – দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১২)

বাংলাদেশের প্রতিটি গনতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন সক্রিয় ভুমিকায়। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয়দফা প্রচারের ক্ষেত্রে তিনি পালন করেছিলেন অগ্রণী ভুমিকা। এই ঐতিহাসিক ৬দফা প্রচার করতে গিয়ে তৎকালিন শাষক গোষ্ঠীর রোষানলে পরে গ্রেফতার হয়ে জেলে বন্দী করে রাখা হয় তাকে। ১৯৬৬ সালে ছয় দফার পরিবর্তে চট্রগ্রাম থেকে যখন সংগ্রামী জননেতা এম এ আজিজের নেতৃত্বে এক দফার অান্দোলন শুরু হল তাতে ঐতিহাসিক লালদীঘির ময়দানে রেখেছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষন সেই ভাষনের পর মিঞা ফারুকী,  এম এ আজিজসহ অনেকেই গ্রেফতার হন। তবুও জেল থেকে প্রচার করেন বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ঐতিহাসিক ছয় দফা সহ এক দফার অান্দোলন। ১৯৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতের মেঘালয়ে চলে যান। সেখানে শরণার্থী শিবিরে ট্রেনিং শেষে আবার বাংলাদেশে ফিরে এসে বীরবিক্রমে যুদ্ধ শুরু করেন। ওনার সাথে আরো যারা ছিলেন তাদের মধ্যে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তোফায়েল আহমদ, মতিয়া চৌধুরীর মত নেতৃবৃন্দ। পাকিস্তানি হায়েনার দল ওনার পটিয়াস্ত ফারুকী পাড়ার নিজ বাড়ীতে এসে ওনাকে না পেয়ে ঘর-বাড়ী আগুন দিয়ে জালিয়ে দেয় এবং আশেপাশের অনেককেই হত্যা করে। তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ওনাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য ১০হাজার টাকা পুরস্কার ও ঘোষনা করেছিল। পাকিস্তানী হায়েনার দল যখন তাঁর বাড়ী আক্রমন করতে আসে তখন মিয়া ফারুকী প্রাণ রক্ষার্থে চাচাতো ভাইয়ের মুরগির ঘরে লুকিয়ে পরেন। খুঁজতে খুঁজতে ওরা ওখনে পর্যন্ত পোঁছে গিয়েছিল কিন্তু, আল্লার রহমতে অল্পের জন্য মৃত্যুমুখী যাত্রী হয়ে ফিরে আসেন তিনি।

দেশ স্বাধীন করার আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও বিভিন্ন লোমহর্ষক ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন এভাবে – ” অসহযোগ আন্দোলনের সময় আমি শহরেই ছিলাম। ২৬ শে মার্চ জহুর আহমেদ চৌধুরীর কাছে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা আসার খবর শুনে এবং দুপুরে তা এম এ হান্নান কর্তৃক বেতারে প্রচারের পর চারদিকে প্রতিরোধ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২৭ মার্চ সকালে আমি পটিয়া এসে হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ প্রক্রিয়ায় অংশ নিই। ১৬ এপ্রিল পটিয়ায় পাকিস্তানি হায়েনা বোমা হামলা চালালে ২০ জনের বেশি সাধারণ মানুষ নিহত ও অনেকে আহত হয়। এদিন থেকে পটিয়া হানাদার বাহিনীর দখলে চলে গেলে আমিসহ অনেক সহকর্মী আত্মগোপন করি। ১৫ জুন খরনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি সম্পাদক আবুল কাশেম, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মনির আহমেদ, ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল গফুরকে সঙ্গে নিয়ে ধোপাছড়ি পাহাড়ে চলে যাই এবং গুংগুরু নামক পাহাড়ে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মিলিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে ভূমিকা রাখি। মাঝে মাঝে গোপনে এসে বাড়িঘর ও এলাকাবাসীর খোঁজ নিয়ে গিয়েছি। এ সময় শুনেছি, সরকার পক্ষ থেকে আমাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। উল্লেখ্য, স্থানীয় চেয়ারম্যান চট্টগ্রামের সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে এলাকার পাকিস্তান বিরোধী হিসেবে ৩৫ জনের একটি তালিকা পাঠায়। সেই তালিকায় ছিল আমার নাম ও।
২৪ মে পাঞ্জাবিরা আগুন দিয়ে আমার বাড়িঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। একই দিন পুড়িয়ে দেয়া হয় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মোহাম্মদ আজহারুল হক, আবুল কাশেম, মনির আহমেদ চেয়ারম্যান ও ছাত্রলীগ কর্মী কবিয়াল এস এম নুরুল আলমের বাড়ি। আগুনে ছাই হয়ে যায় মনির আহমেদ চেয়ারম্যানের মায়ের দেহ! এর কয়েকদিন পরই গুলিতে হত্যা করা হয় আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহ আলমকে! আমার এলাকায় পাঞ্জাবিদের হাতে আরো প্রাণ হারান, কমিউনিস্ট নেতা ভরত চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বপন সরকার, ননা চন্দ্র, স্বপন দত্ত, বরদা রঞ্জন দে, বিশ্বেশ্বর দে প্রমুখ। বিশ্বেশ্বরে হত্যাকাণ্ড ছিল সবচেয়ে হৃদয় বিদারক। তার এক মেয়েকে চেয়েছিল খান সেনারা। রাজি না হওয়ায় তাঁকে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে চরম নির্যাতন চালানো হয় এবং এক পর্যায়ে গুলি করে মারা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সেই দুঃসহ দিনগুলোতে পাহাড়-জঙ্গলে থেকে সহকর্মীদের সাথে কাজ করেছি। তরুণ যুবকদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করার ব্যাপারে উদ্ভুদ্ধ করেছি। এক সময় শরীরের অবস্থা খারাপ হয়ে উঠে! এ অবস্থায় বিজয়ের ছয় দিন আগে ১০ ডিসেম্বর রাত প্রায় ১১টায় বাড়িতে এসেছিলাম একটু স্বস্তিতে রাত কাটানোর আশায়। ভেবেছিলাম শরীরটা একটু ভালো লাগলে আবার চলে যাবো৷ কিন্তু, একদিন পরই আরাম হারাম হয়ে গেল। খবর পেলাম মুক্তি ও মিত্র বাহিনী পটিয়া সদরের কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছে। পটিয়া কলেজে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য আটকে পড়েছে। হানাদারেরা শহরে ফিরে যাবার আগে প্রতিশোধস্পৃহায় মেতে উঠে। ১১ ডিসেম্বর আমাদের গ্রামে আবারো হানা দেয় হায়েনারা। নির্বিচারে ওই দিন হত্যা করা হয়, আব্দুল হাকিম, আবদুস সাত্তার, কামাল আহমেদ ও খাতুনি বেগমকে। এ ছাড়া স্থানীয় রাজাকার ও মাতাল পাকি নরপশুদের হাতে অনেক তরুণ যুবক-যুবতী ও গৃহবধূ পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যা ভাবতে ও লজ্জায় ঘৃণায় বুক ফেটে যায়। আমি এলাকার দরিদ্র কৃষক মোহাম্মদ আলীর ঘরে গোপনে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এভাবে ছয়দিন ও ঘরে কাটানোর পর অবশেষে এলো ১৬ ই ডিসেম্বর। বিকেলে খবর পেলাম পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করেছে। বিজয়ের দিন, বাঙালির জীবনে শ্রেষ্ঠ সোনালি সূর্য উদয়ের দিন। “

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জনাব ফারুকী বিভিন্ন এলাকা ঘুরে অারো অন্যান্য সাথীদের নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতেন। দেশ যখন শত্রুমুক্ত হয়ে বর্বর পাকিস্তানি হায়েনাদের হাত থেকে স্বাধীন হয়, জাতির পিতা তাকে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় পরিষদের কাউন্সিলর নিযুক্ত করেন। এর আগে তিনি অভিভক্ত চট্রগ্রাম জেলা আওয়ামিলীগের প্রচার ও দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব অত্যান্ত নিষ্টার সাথে পালন করেন।
রাজনীতি করতে গিয়ে যিনি পরিবারের খোঁজখবর পর্যন্ত নিতে পারেননি। ওনার সহধর্মিণী রত্নগর্ভা মহীয়সী নারী মরহুমা রোকেয়া বেগম আগলে রেখেছেন পাঁচ কন্যা ও দুই পুত্রসন্তানকে।  জনাব মিয়া ফারুকীর চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় একটি বিখ্যাত লাইব্রেরী ছিল “চট্টল লাইব্রেরী” পরবর্তীতে ফারুকীয়া লাইব্রেরী, শহীদ পুস্তকালয়।  লাইব্রেরীটি ছিল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে তখনকার আওয়ামীলীগের অঘোষিত কার্যালয়।  চট্টগ্রাম সহ দেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও কৃতি ব্যক্তিত্বদের  মিলনস্থল ছিল এটি,  বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রাম আসলে বসতেন এখানে।  ছয়দফা, মুক্তিযুদ্ধ, অসহযোগ আন্দোলন সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হতো এই কার্যালয় থেকে। জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের অত্যন্ত কাছের আস্থাভাজন ছিলেন তিনি। ভাল বক্তা ছিলেন বলে চট্টগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সভা-সমাবেশে বঙ্গবন্ধু তাঁকে বক্তা হিসেবে নিয়ে যেতেন।
১৯৬৭ সালে বঙ্গবন্ধু জেলে থাকা অবস্থায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিয়ের একজন অন্যতম সাক্ষী ছিলেন তিনি। চট্রগ্রামের রাইফেল ক্লাবে শেখ হাসিনার যে বিবাহোত্তর সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল সেই অনুষ্ঠানটি এম আজিজ, জহুর আহমেদ চৌধুরী, আব্দুল্লাহ আল হারুন চৌধুরী, এম এ হান্নান সহ তৎকালিন নেতাদের সাথে আয়োজক ছিলেন। বিয়ের পর জেলে বঙ্গবন্ধুর সাথে যখন শেখ হাসিনা, স্বামী ওয়াজেদ আলী সহ অন্যান্য নেতাকর্মীরা দেখা করতে গিয়েছিলেন তখন বঙ্গবন্ধু কন্যার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আমি নেই তাতে কি হয়েছে তোর চাচারা তো আছেন। ” শেখ হাসিনা মিয়া ফারুকী সহ আওয়ামীলীগ নেতাদের চাচা বলে ডাকতেন “

১৯৭৫ সালে জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে কিছু কুলাঙ্গার পরাজিত শক্তির হাতে নিহত হলে তিনি সক্রিয় রাজনিতী থেকে অবসর নেন। নির্মম ঐ কালরাতের সপ্তাহখানেক আগেও অনন্য সহকর্মীদের সাথে ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে তিনি বলেন – তোরা দেশের জন্য রক্ত দিয়েছিস, আমি তোদের স্বাধীনতা দিয়েছি এবার একটু বিশ্রাম নিতে চাই। ঠিক এক সপ্তাহ পরেই কিছু মীরজাফর কুলাঙ্গার ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে! রাজনিতী থেকে সরে আসলেও তিনি কলমের মাধ্যমে তুলে ধরেন এই দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনিতী সহ বিভিন্ন বিষয়।  ওনার লেখা প্রায় সাড়ে চারহাজার প্রবন্ধ, নিবন্ধ   দেশের বিভিন্ন পত্র- পত্রিকা, ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছে। মিয়া ফারুকীর একটি নিজের লেখা বই বের হয়েছে “আমার দেখা সেকাল একাল”। যেখানে তিনি তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, ইতিহাসখ্যাত বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জীবনী, বর্তমান ও সেখালের রাজনীতির তুলনামূলক পার্থক্য ও দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি।
১৯৮০ সালে মিয়া ফারুকী অসুস্থ হলে তার গ্রামের বাড়ী ফারুকী পাড়ায় দেখতে আসেন সাবেক রাষ্টপতি জিল্লুর রহমান, তোফায়েল আহমদ, সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। চট্রগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি করা হলে সেখানে দেখতে আসেন আব্দুস সামাদ আজাদ, মোহাম্মদ নাসিম সহ আওয়ামিলীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। ওনার পাঁচ ছেলে দুই মেয়ে মধ্যে বড় ছেলে আন্তরজাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ফটোগ্রাফার শোয়েব ফারুকী, ছোট ছেলে চট্রগ্রাম পাহাড়তলি চক্ষু হাসপাতালে কর্মরত ও সঙ্গীতশিল্পী  শিল্পী শহীদ ফারুকী প্রত্যেকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে দেশের অবদান রাখছেন।
বর্তমান দেশ রাজনীতির এক গভীর ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। যাদের হাতে এসেছিল বিশ্বমানচিত্রে একটি লাল-সবুজের পতাকা, যাদের জনকল্যাণ মূলক কাজে সাধারণ মানুষের ভাগ্যন্নোয়ন হয়েছিল সেই সকল বীর যোদ্ধারা আজ বড়ই অসহায়।  স্বাধীন সার্বভৌম দেশে, মুক্ত বাতাসে, শান্তিতে নিঃশ্বাষ নেয়ার অধিকারও কেড়ে নেয়া হচ্ছে তাঁদের কাছ থেকে।   সংকটময় এই মুহূর্তে মিয়া ফারুকীর মত সর্বত্যাগী নেতাদের খুবই প্রয়োজন ছিল। মহান আল্লাহর কাছে এই মহান ব্যক্তিত্বর জান্নাত কামনা করছি।

লেখক : কবি, ছড়াকার ও প্রাবন্ধিক
সদস্য : চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র (সিএইচআরসি)
সাতবাড়িয়া খন্দকার পাড়া (ক্বারি সাহেবের বাড়ি), চন্দনাইশ, চট্টগ্রাম


Spread the love