অবশেষে ফিরল নূর হোসেন

102
Spread the love

43299_2যশোর অফিস : উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে হস্তান্তর করার পরদিনই নানা জল্পনা-কল্পনা শেষে অবশেষে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে ফেরত পাঠাল ভারত। বেনাপোল সীমান্তে দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতেই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিএসএফ আলোচিত নূর হোসেনকে বাংলাদেশ পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলের কাছে হস্তান্তর করে। পরে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে নূর হোসেনকে নিয়ে বিশেষ টিম ঢাকার উদ্দেশ্যে সড়ক পথে রওনা দেয়। আলোচিত নূর হোসেনকে হস্তান্তরকালে বাংলাদেশ পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বিজিবি-২৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাহাঙ্গীর হোসেন, বেনাপোল উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ওসি বেনাপোল অর্পূব হাসান ও নারায়ণগঞ্জের পুলিশের একটি দল। এর আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা থেকে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে নূর হোসেনকে নিয়ে পেট্রাপোল সীমান্তের দিকে রওয়ানা হয়েছে ভারতীয় পুলিশ। রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ নূর হোসেনকে বিএসএফ’র কাছে হস্তান্তর করে। এর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে নূর হোসেনকে বুঝিয়ে দেয়া হয়। ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা নূর হোসেনকে বুঝে নেন বলে পশ্চিমবঙ্গের থেকে একটি সূত্র জানিয়েছেন। ভারতীয় হাইকমিশন থেকেও খবরটি নিশ্চিত করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের একটি সূত্র জানিয়েছে দমদম কারাগার থেকে নূর হোসেনকে নিয়ে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি দল পেট্রাপোল সীমান্তের দিকে রওনা দেয় সন্ধ্যার দিকে। বেনাপোল পুলিশ সূত্র জানায়, রাত পৌনে নয়টার দিকে বাংলাদেশ পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল ভারত সীমান্তে বিএসএফ ক্যাম্পে পৌঁছায়। রাত পৌনে ১০টার দিকে নূর হোসেনকে হস্তান্তর করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, নূর হোসেনকে ভারত থেকে আনার ব্যাপারে সব ধরনের আইনগত জটিলতা শেষ হয়েছে। তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে । স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম-সচিব বলেন, নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিজিপির একটি টিম একযোগে কাজ করছে। হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সেখান থেকে রাতেই সড়ক পথে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হবে। প্রসঙ্গত, উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে ১১ নভেম্বর ভারতের কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশ সরকার। এর একদিন পর নূর হোসেনকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নিল ভারত সরকার। ভারতের স্বাধীনতাকামী সংগঠন উলফার নেতা অনুপ চেটিয়া ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে গ্রেফতার হন। এরপর থেকে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলে বন্দী ছিলেন। অনুপ চেটিয়াকে ভারতের কাছে হস্তান্তর এবং নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ওইদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনুপ চেটিয়া যেভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারত গিয়েছে, ঠিক একইভাবে নূর হোসেনকে ফিরিয়ে আনা হবে।’ ‘তাদের সরকার (ভারত) যেদিন আমাদের (বাংলাদেশ) বলবে সে (নূর হোসেন) মুক্ত হয়েছে, তখন আমরা তাকে নিয়ে আসব। ঠিক এইভাবেই অনুপ চেটিয়ার মতো বর্ডারে (সীমান্তে) তাকে রিসিভ করব। যেভাবে সে (অনুপ চেটিয়া) চলে গেল’ যোগ করন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। নূর হোসেন ধরা পড়ার পর বাংলাদেশ তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে অনুরোধ করে। দুই দেশের আলোচনার ভিত্তিতে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নূর হোসেনের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার করে তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আবেদন করে আদালতে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার মুখ্য বিচারিক হাকিম সন্দীপ চক্রবর্তী ১৬ অক্টোবর নূর হোসেনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতের সরকারি কৌঁসুলি বিকাশ রঞ্জন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ভারতের ফৌজদারি কার্যবিধির ৩২১ ধারায় নূর হোসেনকে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা থেকে প্রত্যাহার করে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আবেদন জানানো হয়েছিল। বিচারক আবেদন মঞ্জুর করেছেন। এই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ নেই। উল্লেখ্য গত বছরের ২৭ এপ্রিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ তার কয়েকজন সহযোগীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ৩০ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মদনগঞ্জের শান্তিনগর এবং চরধলেশ্বরী এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার, মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম এবং গাড়ি চালক ইব্রাহিম ও লিটনসহ অপহৃত ৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ইট বোঝাই সিমেন্টের ব্যাগ দিয়ে বাঁধা অবস্থায় নদীতে ডোবানো হয়েছিল লাশগুলো। পা ছিল দড়ি দিয়ে বাঁধা। হাত পেছনে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। মুখমণ্ডল পলিথিন দিয়ে গলার কাছে বাঁধা ছিল। পেট ধারালো অস্ত্র দিয়ে সোজাসুজি ফাড়া ছিল। ওই ঘটনায় র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-১১)-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জড়িয়ে যান, যা সে সময় দেশজুড়ে হইচই ফেলে দেয়। সাত খুনের পর নজরুলের স্ত্রী বাদী হয়ে নূর হোসেনকে প্রধান আসামি করে একটি মামলা করেন। আর চন্দন সরকারের পরিবার অজ্ঞাতনামা আসামির কথা উল্লেখ করে আরেকটি মামলা করে। দু’টি মামলায় এ বছরের এপ্রিলে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এতে নূর হোসেনসহ মোট ৩৫ জনকে আসামি করা হয়। হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে র‌্যাব-১১ এর ২৫ জন সদস্যকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে আছেন র‌্যাব-১১ এর তখনকার অধিনায়ক লেঃ কর্নেল তারেক মোহাম্মদ সাঈদ, মেজর আরিফ ও লেঃ কমান্ডার এম এম রানা। সাত খুনের ঘটনার পরপরই নূর হোসেন ভারতে পালিয়ে যান এবং গত বছরের ১৪ জুন উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বাগুইআটি থানার ইন্দ্রপ্রস্থ আবাসনের পঞ্চম তলার একটি ঘর থেকে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। অবৈধভাবে ভারতে অবস্থানের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। তখন থেকে তিনি দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন।


Spread the love