ব্রেকহীন অবৈধ নছিমন-করিমন-ভটভটি এখনও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গ্রাম অঞ্চলে

93
Spread the love

43241_fজাহাঙ্গীর আলম : গেল বছর ডুমুরিয়ার খলশীর রবিউল গাজীর স্ত্রী দু’বছরের অবুঝ শিশুকে কোলে নিয়ে অবৈধ যান নছিমনে চড়ে বাবার বাড়ি উলা গ্রামে যাচ্ছিলেন। মাছুম শিশুটি মায়ের কোলে আপন মনে খেলছিল। ব্রেকহীন ঘাতক নছিমন হঠাৎ দুর্ঘটনায় পতিত হয়। মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়ে শিশুটি। আর ঘটনাস্থলেই ফুটফুটে বাচ্চাটির জীবন প্রদীপ নিভে যায়। এখনও কান্না থামেনি রবিউল পরিবারের। মির্জাপুরের মতুয়া সংঘের সদস্য ষাটোর্ধ গুরুদাস মন্ডল নছিমন থেকে পড়েই মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন। হাজিডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সকলের প্রিয় অংকের শিক্ষক অমল কান্তি মন্ডল নছিমনের ধাক্কায় গেল ৬ মাস ধরে পঙ্গু। ভ্যান চালক সিদ্দিকের একটি পা নছিমন দুর্ঘটনায় খণ্ড-বিখণ্ড। লাঠি এখন তার চলাচলের একমাত্র ভরসা। শুধু রবিউল তার ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ নয়, আর সিদ্দিক শুধু পঙ্গু হয়ে বেকার হয়নি। অবৈধ নছিমন-করিমন-ভটভটি আর আলম সাধুতে অসংখ্য মানুষের প্রাণ চলে গেছে। এ অবৈধ নছিমন অনেক মায়ের কোল খালি করেছে, এতিম হয়েছে ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী তার স্বামীকে হারিয়ে বিধবা হয়েছে। আর পঙ্গুত্ববরণ করেছে সহস্র মানুষ। তবুও বিরামহীন ভাবে চলছে এসব অবৈধ গণপরিবহন নছিমন-করিমন-ভটভটি। সরেজমিন ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, স্যালো ইঞ্জিনের সাথে ভ্যানের থেকে একটু বড় কাঠের বডি লাগিয়ে স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হয় এসব অবৈধ বাহন নছিমন, করিমন ও আলমসাধু। নগরীতে চলাচল না করলেও জেলার ৯ উপজেলায় কমপক্ষে ৪০ হাজার এ অবৈধ যান চলাচল করছে। শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রশিক্ষণের বালাই নেই এসব পরিবহন চালকদের। শাপলা ফুলের পাপড়ির মত যাত্রীদের নছিমনের চারিপাশ দিয়ে বসানো হয়। সরকারিভাবে এসব যান চলাচলের ওপর কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তারপরেও এক দিনও বন্ধ নেই এসব পরিবহন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ প্রশাসনকে নিয়মিত মাসিক মাসোহারা দিয়ে এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এ অবৈধ যান চলাচল করছে। নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে প্রতিদিনই মহাসড়কে নছিমন-করিমন চলতে দেখা যায়। খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের জিলেরডাঙ্গা নামক স্থানে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলা ট্রাফিকের ৪ জন সদস্য গাড়ি চেকিং করে থাকেন। হোগলাডাঙ্গার প্রগতি স্কুলের সামনে ২৪ ঘন্টা ডিউটিরত রয়েছে হরিণটানা থানা পুলিশ। অদৃশ্য কারনে তাদের চোখে ধরা পড়ে না এসব অবৈধ যান চলাচল। অথচ গত রবিবার সকালে ১ ঘন্টা অভিযান চালিয়ে ডুমুরিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ৫টি নছিমন আটক করেন এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়। মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী এ কর্মকর্তা বলেন, ট্রাফিক বিভাগ ও পুলিশ প্রশাসন আন্তরিক হলে এবং সহজ সরল জনগণ সচেতন হলে একদিনেই এসব অবৈধ যান চলাচল বন্ধ করা সম্ভব। নছিমনের দুর্ঘটনায় হতাহতের কোন পরিসংখ্যান সরকারি কোন সংস্থার কাছে নেই। তবে বেসরকারি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হিসেব অনুযায়ী গত বছর ৯ উপজেলায় নছিমনের সাথে দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৪৭ জন। পঙ্গুত্ব বরন করেছেন ১০৬ জন। জেলা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক আল মামুন জানান, নছিমন-করিমন বন্ধে সব সময় কাজ করছে ট্রাফিক পুলিশ। গতকাল খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে অভিযান চালিয়ে ২৫টি নছিমন আটক করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ে ট্রাফিক ব্যবস্থা নেই। সেকারনে নছিমন-করিমনসহ সকল অবৈধ যানবাহন আটক করার কথা রয়েছে সংশ্লিষ্ট থানার। তিনি আরও বলেন, মহাসড়কে একেবারে সীল করে দেয়া হয়েছে। এসব জায়গায় কোন নছিমন চলাচল করতে পারবে না। দাকোপ উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আবুল হোসেন বলেন, এ উপজেলাটি প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন উন্নত নয়। আধুনিক বাহন চলাচল সম্ভব নয়। যে কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে নসিমন-করিমন বেছে নেন। তবে সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে অবৈধ এ যান চলাচল অনেক কমেছে বলেও জানান তিনি। অপর দিকে ডুমুরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান খান আলী মনসুর বলেন, মহাসড়কে নসিমন-করিমন চলাচল না করলেও জনগণের চাহিদার কারণে অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচল করছে। বিশেষ করে মালামাল বহনে সহজতর হওয়ায় অন্যতম ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই বাহনটি বেছে নিয়েছে। দ্রুত এবং সহজ বাহন হওয়ায় পথচারীরাও এতে ওঠতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, নছিমন-করিমন বন্ধে কড়াকড়ি নির্দেশনা দেয়া আছে। কোন উপজেলায় এসব অবৈধ যান চলাচল করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। এসব যান চলাচলে প্রশাসনের কোন ব্যক্তি জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।f

Spread the love