মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌচাষীরা চলনবিল এলাকায় ৪০ কোটি টাকার মধু উৎপাদনের সম্ভাবনা

192
Spread the love

ইকবাল কবীর : চলনবিলের প্রত্যন্ত এলাকার মাঠ গুলো ছেয়ে গেছে সরিষার হলুদ ফুলে-ফুলে। যে দিকে তাকানো যায় চারিদিকে কেবল হলুদের সমারোহ। দেখে যেন প্রাণ জুড়িয়ে যায়। চলনবিল এলাকায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। চলনবিলকে সুশোভিত করতে প্রকৃতি যেন উদার। সরিষার হলুদ ফুলে ফুলে পাখা মেলছে মৌমাছি। মৌমাছির গুঞ্জনে যেন মাতাল হয়েছে চলনবিলের বাতাস। চলতি মৌসুমে চলনবিলে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৮ শতাধিক মৌ-চাষি মৌবক্স নিয়ে চলনবিলের বিভিন্ন স্থানে উপকারী খাদ্য পণ্য মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন। চলনবিলের বুক চীরে বয়ে যাওয়া বনপাড়া হাটিকুমরুল মহাসড়কের দুইপাশ, মান্নান নগর- চাটমোহর সড়কের দুই পাশ সহ চলনবিলের পরতে পরতে মৌচাসীরা এখন মধু সংগ্রহে ব্যস্ত। চলতি মৌসুমে চলনবিল এলাকা থেকে প্রায় আড়াই হাজার টন মধু সংগ্রহ হতে পারে বলে জানান উত্তরাঞ্চল মৌচাষী সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম।

গ্রাম বাংলার দাদী নানীরা নতুন শিশু ভূমিষ্ঠ হবার পর তার মুখে প্রাকৃৃতিক খাদ্য মধু দিয়ে স্বাগত জানান পৃথিবীতে। খাদ্য হিসেবে, মিষ্টি হিসেবে, চিকিৎসা ও সৈর্র্ন্দর্য চর্চায় তরল আঠালো মিষ্টি জাতীয় পদার্র্থ মধুর ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশে সাধারণত এপিস ফ্লোরিয়া, এপিস সেরানা ইন্ডিকা, এপিস মেলিফ্লেরা, এপিস ডর্র্সাটা জাতের মৌমাছি চাষ করা হয়। মৌমাছিরা ফুল থেকে নেকটার বা পুষ্পরস হিসেবে সংগ্রহ করে মৌচাকে জমা রেখে প্রাকৃতিক নিয়মে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গ মধু তৈরী করে কোষে আবদ্ধ রেখে সংরক্ষণ করে। এটি অগাজানোশীল মিষ্টি জাতীয় বিশুদ্ধ পদার্থ। অপ্রক্রিয়াজাত মধুতে ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ আদ্রতা থাকে। ফুলের পরাগের মধুতে থাকে ২৫ থেকে ৩৭ শতাংশ গ্লুকোজ, ৩৪ থেকে ৪৩ শতাংশ ফ্রুক্টোজ, ৫ থেকে ১২ শতাংশ মন্টোজ, ২২ শতাংশ অ্যামাইনো এসিড, ২৮ শতাংশ খনিজ লবন, ১১ শতাংশ এনজাইম। ১শ গ্রাম মধুতে পাওয়া যায় ২৮৮ ক্যালরী। এসময়ে সরিষা কালোজিরা ধনিয়াসহ বিভিন্ন ফুল থেকে মৌমাছি পুষ্প রস সংগ্রহ করে। চলনবিল এলাকার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া ও আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভাবে এ শস্য গুলো চাষ হওয়ায় প্রতিবছর এসময় দেশের বিভিন্ন এলাকার মৌচাষীরা মৌবক্স নিয়ে আসেন এ এলাকায়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে চলনবিল অঞ্চল থেকে প্রায় আড়াই হাজার টন মধু আহরণের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মৌচাষীরা। পর পরাগায়ন উদ্ভিদের বংশ বিস্তারের ক্ষেত্রেও মৌমাছি ভূমিকা রাখে। মৌবক্স ছাড়াও গাছের শাখা দেয়ালের কার্নিশসহ বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় প্রাকৃতিক মৌচাক।

চাটমোহরের বড় গুয়াখরা গ্রামের মায়ের দোয়া মৌখামারের মালিক আবুল কালাম মধু সংগ্রহের জন্য অস্থায়ী আবাস গড়েছেন চলনবিলের চাটমোহরের ধরমগাছা এলাকায়। কালামের বাবা নবীর উদ্দিন মধু সংগ্রহের কাজ করছেন। তিনি জানান, ১৫০ টি মৌবক্স রয়েছে তার খামারে। ৮ থেকে ১০ দিন পর পর বক্স থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি বক্স থেকে গড়ে ২ থেকে ৩ কেজি মধু পাওয়া যায়। রাণী মৌমাছি বক্সে আটকে রাখা হয়। অন্য মৌমাছিরা সরিষা ক্ষেত থেকে মধু এনে মৌবক্সে জমা করে। দেড় দুই মাস এভাবে মধু সংগ্রহ করা যাবে। তবে পাইকারী ক্রেতারা সিন্ডিকেট করায় তারা এসময় মধুর ন্যায্য মূল্য পান না বলে জানান।

চলনবিলে মধু সংগ্রহে এসেছেন সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের মৌ-চাষি মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি জানান, প্রতি বছরই চলনবিল এলাকায় মধু সংগ্রহে আসেন তারা। অস্থায়ী ঘর তৈরী করেন। এবছর ও এসেছেন। মধু সংগ্রহে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। সম্ভাবনাময় এ পণ্য রফতানী করে বিপুল পরিমান বৈদেশিক মূদ্রা আয় করা সম্ভব বলে তিনি জানান।

আল্লাহর দোয়া নামক খামারের মালিক মোস্তফা জানান, সরিষার জমির পাশে মৌবক্স রেখে মৌমাছি ছেড়ে দেয়া হয়। মৌমাছির দল সরিষা ফুল থেকে মধু আহরণ করে বক্সে থাকা মৌচাকে জমা করে। পরে তারা সেখান থেকে মধু সংগ্রহ করেন। বর্তমানে প্রতিমণ মধু ৬ থেকে ৭ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

উত্তরাঞ্চল মৌচাষী সমিতির সভাপতি চাটমোহরের জাহাঙ্গীর আলম জানান, চলনবিল এলাকা থেকে এ বছর প্রায় আড়াই হাজার টন মধু আহরণের সম্ভাবনা রয়েছে। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৪০ কোটি টাকা। প্রায় মাস খানেক পূর্ব থেকে বগুড়া যশোর কুষ্টিয়া খুলনা সাতক্ষিরা পাবনা নাটোর সিরাজগঞ্জের প্রশিক্ষিত ৮ শতাধিক মৌখামারী মধু সংগ্রহ করছেন। সেখানে দেড় থেকে ২ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। একজন মৌচাষী এ মওসুমে গড়ে প্রায় ৩ টন করে মধু সংগ্রহ করবে। এ এলাকার মধুর গুনগত মান ভাল হওয়ায় বিভিন্ন কোম্পানী চলনবিলের মাঠ থেকে অপরিশোধিত মধু সংগ্রহ করে। গত বছর জাপানে প্রায় ১শ টন মধু রফতানী করা হয়। কয়েক দিন পূর্বে স্লোভেনিয়ার কৃষি মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মধু বিশেষজ্ঞ দল চলনবিল এলাকার মধু চাষ পরিদর্শন করেছে। তারা মধু কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে সরকারী ভাবে পদক্ষেপ নিলে মধু হতে পারে আমাদের অন্যতম রফতানী পণ্য।

তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম জানান, মধুর উৎপাদন নির্ভর করে আবহাওয়ার উপর। আবহাওয়া ভাল থাকলে উৎপাদন বেশি হয়। চলনবিল এলাকার বিস্তির্র্ণ মাঠ জুরে সরিষার হলুদ ফুলে ছেয়ে গেছে। মধু চাষিদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ বিষয়ে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে। আশা করছি আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে চলতি মৌসুমে সরিষা এবং মধু উভয়ের উৎপাদন ভাল হবে।


Spread the love