মরণঘাতী ২০২০ সাল! মহামারী করোনা ভাইরাসের কবলে আলেম সমাজ

56
Spread the love

মোহাম্মদ ইমাদ উদ্দীন : ২০২০ সালের আলোচিত নাম চলমান মহামারী করোনা ভাইরাস। এই ভাইরাস নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের গজব কিংবা আযাব হলেও মুৃমিনদের জন্য রহমত স্বরুপ ও পরীক্ষা। মহান তাআলা ইরশাদ করেছেন, “নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা, জান ও মাল এবং ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। (হে পয়গম্বর!) আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।” (সূরা বাক্বারাহ ১৫৫)
হাদীস শরীফে এসেছে, আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একবার মহামারী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি। তিনি উত্তরে বলেন—মহামারী একটা আযাব, আল্লাহ যার ওপর ইচ্ছা পাঠান। তারপর আল্লাহ তাআলা মহামারীকে মুমিনদের জন্য রহমত বানিয়ে দেন। কোনো বান্দা যদি মহামারী আক্রান্ত এলাকায় থাকে এবং নিজ বাড়িতে অবস্থান করে, ধৈর্য ধারণ করবে এবং সওয়াবের প্রত্যাশায় থাকবে; এবং এই বিশ্বাস রাখবে—আল্লাহ তাআলা যদি তার তাকদিরে লিখে না থাকেন, তাহলে মহামারী তাকে আক্রান্ত করতে পারবে না। তাহলে তার জন্য রয়েছে একজন শহিদের সমপরিমাণ প্রতিদান। (সহীহ বুখারি, হাদিস নং-৬৬১৯, ৫৭৩৪; মুসনাদে আহমদ ২৬১৮২)
হাদীসের ভাষায়, মহামারিতে মারা যাওয়া ব্যক্তিও শহীদ। হাদীস শরীফে আছে, আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, পাঁচ প্রকার মৃত শহীদ—মহামারিতে মৃত, পেটের পীড়ায় মৃত, পানিতে ডুবে মৃত, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত এবং যে আল্লাহর পথে শহীদ হলো। (সহীহ বুখারি, হাদিস : ২৮২৯)
অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, মহামারিতে মৃত্যু হওয়া প্রতিটি মুসলিমের জন্য শাহাদাত। (সহীহ বুখারি, হাদিস : ২৮৩০)
মরণঘাতী ২০২০ সাল! মহামারী করোনা ভাইরাসের কবলে বহু আলেম-ওলামা ও পীর মাশায়েখ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। যারা জাতিকে আলোর পথ দেখিয়েছেন।একজন আলেমের বিদায় মানে একটি নক্ষত্রের বিদায় এবং মুসলিম জাতি অভিভাবকহারা হওয়া৷ হাদীসের ভাষায়, “আলেমের মৃত্যু মানে একটি জাহানের মৃত্যু”। আল্লাহ তায়ালা ইলম বা দ্বীনকে উঠিয়ে নিবেন আলেমগণকে উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে।” সেই হিসেবে শীর্ষ আলেমদের এ বিদায়ের মিছিল বাংলাদেশের জন্য বিরাট শূন্যতা তৈরি করেছে।
শাহ সূফী আল্লামা কুতুব উদ্দিন (রহ:):
চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফের পীর শাহ সূফী আল্লামা কুতুব উদ্দিন (রহ:)। ৯ মার্চ ১৯৩৯ সালে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর ইউনিয়নের সুফি মিয়াজীপাড়া গ্রামে জন্ম তাঁর।এই আলেমে দ্বীন একজন বিশিষ্ট সমাজ সেবক, সমাজ সংস্কারের অন্যতম পুরোধা, শরীয়ত বিরোধী ও অনৈসলামিক কার্যকলাপ উচ্ছেদ আন্দোলনের আপোষহীন প্রবক্তা, সত্যনিষ্ঠা এবং বাতিল মতাবাদের আতংক ছিলেন।এমন কি তিনি একজন সংগঠকও বঠে। তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের শরিয়াহ সুপারভাইজরি কাউন্সিলের চেয়ারম্যানসহ অসংখ্য মাদরাসা, মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এবং বায়তুশ শরফ দরবারের পীর সাহেব ছিলেন। তিনি ছিলেন বড় অন্তরের অধিকারী ও মধ্যমপন্থী আলেমে দ্বীন। গত ২০ মে ২০২০ সালে বিকেল ৫টায় রাজধানীর আনোয়ার খাঁন মেডিকেলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ডাকে চিরদিনের জন্য সাড়া দেন। বৃহস্পতিবার (২১ মে) ফজরের নামাজের পর মরহুমের ছেলে মাওলানা বেলাল উদ্দিনের ইমামতিতে বায়তুশ শরফ দরবারে মসজিদের পাশে মরহুম পীর শাহ সূফী আব্দুল জাব্বার রহ. এর কবরের পাশে দাফন করা হয়।
আল্লামা গোলাম সরোয়ার সাঈদী (রহ):
উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন, আড়াইবাড়ী কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ও আড়াইবাড়ী দরবার শরীফের পীর আল্লামা গোলাম সারোয়ার সাঈদী । বেশকিছু দিন ঢাকার এপোলো হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ২১ নভেম্বর ২০২০ শনিবার ভোর সাড়ে চারটায় ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন সুবক্তা ও ওয়ায়েজ। বিগত কয়েক বছরে ইউটিউবে দীনের বিভিন্ন বিষয়ের উপর তার বয়ান ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
মাওলানা তৌহিদুল ইসলাম:
মাওলানা তৌহিদুল ইসলাম দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর সিকদার পাড়ার মাওলানা ছাবের আহমদের ছেলে। তিনি সৌদি আরবের মদিনায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১৮ এপ্রিল,শনিবার বাংলাদেশ সময় ভোর সাড়ে ৬টায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ফেব্রুয়ারিতে ছুটি নিয়ে বাংলাদেশ থেকে ঘুরেও গিয়েছিলেন। উল্লেখ্য তিনি সৌদি আরব যাওয়ার আগে চট্টগ্রাম নগরীর প্যারেড মাঠ সংলগ্ন টাক শাহ মিয়া মাজার জামে মসজিদ, হামিদচর জামে মসজিদসহ একাধিক মসজিদে দ্বীন ইসলামের খেদমত করেছেন।
অধ্যক্ষ মাওলানা রফিকুল ইসলাম:
কিশোরগঞ্জ শহরের নগুয়া এলাকার বাসিন্দা করোনাভাইরাস কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইলের জাহাঙ্গীরপুর আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা রফিকুল ইসলাম (৫২) বুধবার (২৯ জুলাই,২০২০) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।
মাওলানা মো. সিরাজ উল্লাহ:
কক্সবাজারের চকরিয়ায় করোনা আক্রান্ত হয়ে হাফেজ মাওলানা মো. সিরাজ উল্লাহ (৭০) ঈদের দিন সকাল পৌনে ১১ টায় হাসপাতালের আইসোলেশনে মারা যান।তিনি দৈনিক ইনকিলাবের কক্সবাজার জেলা সংবাদদাতা সাংবাদিক জাকের উল্লাহ’র মেঝোভাই। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সুপারভাইজার ছিলেন।
তাছাড়া করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক এক অধ্যক্ষ ইন্তেকাল করেন। সরকারের পক্ষ থেকে মৃত ব্যাক্তির নাম প্রকাশ না করলেও পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরটি ছড়িয়ে পড়েছিলো। সত্তরোর্ধ এই শিক্ষাবিদ ২১ মার্চ, ২০২০ সালে রোজ শনিবার রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন
এমন কি মহামারী করোনা যুদ্ধে মসজিদের অনেক ইমামও ইন্তেকাল করেন। করোনাযুদ্ধে শহীদ হওয়া সকল আলেমে দ্বীন ও পীর মশায়েখ মসজিদের ইমাম ও খতীবদেরকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন শাহাদাতের মর্যাদা দিয়ে জান্নাতুল ফেরদাউসের মেহমান হিসেবে কবুল করুক। আমিন।

লেখক: কলামিস্ট।
প্রচার ও প্রকাশনা সচিব, বাংলাদেশ মুসলমান ইতিহাস সমিতি।


Spread the love