মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বেনাপোল থেকে ব্যবসায়ীরা

116
Spread the love

Benapole-Customsযশোর অফিস : দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আমদানি করা পণ্যের ওপর ইচ্ছামতো শুল্কায়ন ও জরিমানা করছেন। তুলনায় মংলা, হিলি, ভোমরা, সোনামসজিদ দিয়ে পণ্য আমদানি লাভজনক। দেশে ভারত থেকে মালামাল আমদানি না কমলেও বেনাপোলে বন্দরে পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর প্রভাব পড়ছে রাজস্ব আদায়ের। অর্থবছরের প্রথমম চার মাসে এই বন্দরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায় কম হয়েছে ১৩০ কোটি টাকা। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ অবশ্য ব্যবসায়ীদের কথা মানতে নারাজ। তারা বলছেন, ঈদ-পূজার লম্বা ছুটির কারণে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চার মাস আগেও বেনাপোল কাস্টমসে রাজস্ব আদায়ের হার ছিল স্বাভাবিক। জাতীয় রাজস্ব বোডের বেঁধে দেওয়া অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে গিয়ে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এছাড়া কাস্টম হাউজে কর্মরত ঊর্ধ্বতন তিন কর্মকর্তার মধ্যে রয়েছে সমন্বয়হীনতা। বর্তমানে বেনাপোল কাস্টম হাউজে শীর্ষ পদে কর্মরতদের সবাই এর আগে আয়কর বিভাগে কাজ করতেন। ফলে তারা আমদানি পণ্যের শুল্কায়নের ব্যাপারে অনভিজ্ঞ। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাজস্ব আদায় বাড়াতে গিয়ে আমদানিকৃত সব ধরনের পণ্যের শুল্কমূল্য বাড়ানো হয়েছে এমনকী কয়েক গুণ পর্যন্ত। আবার এসব বাড়ানো মূল্যের ওপর ইচ্ছামতো জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। এর ফলে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সঙ্গে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। হয়রানির ভয়ে তারা বেনাপোল ছেড়ে মংলা, হিলি, সোনামসজিদ, ভোমরা প্রভৃতি বন্দরের দিকে ঝুঁকছেন। ওই সব বন্দরে শুল্কমূল্য কম বলে তাদের দাবি। চলে যাওয়া আমদানিকারকদের বেনাপোলমুখী করতে কাস্টম কর্তৃপক্ষেরও কোনো উদ্যোগ নেই। ভারত থেকে পণ্য আমদানির সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোল। আগে এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন আমদানি হতো প্রায় ৫০০ ট্রাক পণ্য। বর্তমানে আমদানি নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। উচ্চ শুল্কহারের পণ্যগুলো অধিকাংশ এখন আমদানি হচ্ছে মংলা বন্দর দিয়ে। ফল, পেঁয়াজ, চাল, মাছসহ পচনশীল পণ্য আসছে ভোমরা, হিলি ও সোনামসজিদ বন্দর দিয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে (২০১৫-১৬) বেনাপোল কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা  হয়  তিন হাজার ১৪৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। জুলাই থেকে অক্টোবর প্রথম চার  মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক হাজার সাত কোটি ৯৯ লাখ টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে ৮৭৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৪৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৯০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। আগস্টে ২৫২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৪৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সেপ্টেম্বর মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৬৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। সেখানে আদায় হয়েছে ২০৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এবং অক্টোবরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৪৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। আদায় হয়েছে ২৩২ কোটি ২১ লাখ টাকা। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের শেষ ছয় মাসে রাজস্ব ঘাটতি হয় এক হাজার ১১৪ কোটি টাকা। তখন রাজনৈতিক অস্থিরতাকে এ জন্য দায়ী করা হয়। তা সত্ত্বেও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্য খালাসের বিপরীতে জমাকৃত জামানত বন্ড নগদায়ন করে ঘাটতি পূরণ করে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দেখায়। যশোরের আমদানিকারক আল আমিন এন্টারপ্রাইজের মালিক মিজানুর রহমান বলেন, ‘আগে এক-দু’দিনে বেনাপোল দিয়ে সব ধরনের মালামাল ছাড় করিয়ে নেওয়া যেত। একই মাল ছাড়াতে এখন সময় লাগে কমপক্ষে দশদিন। কর্তৃপক্ষ শুল্ক বাড়িয়েছে প্রায় তিন গুণ। ডিউটি দিয়ে মাল ছাড়িয়ে লোকসান গুণতে হচ্ছে। চোরাচালানিদের মাধ্যমে আসা মাল কম দামে বিক্রি হচ্ছে। এসব কারণে বেনাপোল দিয়ে মাল আমদানি করছি না।’ বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি আলহাজ নুরুজ্জামান অভিযোগ করে বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দরটিকে ধ্বংস করার জন্য একটি মহল গভীর ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। বেনাপোল কাস্টম কর্মকর্তারা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই আমদানিকৃত পণ্যের শুল্কায়ন মূল্য বাড়িয়েছেন, ইচ্ছেমতো পণ্যের এইস এস কোড পরিবর্তন করছেন।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বেনাপোল কাস্টম হাউসে কর্মরত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এর আগে ভ্যাটে চাকরি করতেন। আমদানি পণ্য থেকে রাজস্ব কীভাবে আহরণ করতে হয় সে বিষয়ে তাদের ধারণা কম। বর্তমানে বেনাপোলে ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ নেই। সে কারণে দিন দিন বেনাপোল বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি কমে যাচ্ছে।’ বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, ‘কাস্টম কর্মকর্তাদের হয়রানির কারণে বেনাপোল দিয়ে মাল আমদানি কমে গেছে। প্রতিদিন আমরা প্রায় ৫০০ ট্রাক মালামাল পরিবহন করতাম। এখন তা কমে এসেছে অর্ধেকে। কাজ কর্ম না থাকায় অফিসের স্টাফরা কাজ ছেড়ে চলে যাচ্ছে।’ তবে ব্যবসায়ীদের এ ধরনের অভিযোগ মানতে নারাজ কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার এএফএম আব্দুল্লাহ খান দাবি করেন, ঈদ, পূজাসহ বিভিন্ন বন্ধের কারণে ভারত থেকে মালামাল আমদানি কম হওয়ায় রাজস্ব আদায় কিছুটা কম হয়েছে। ঘাটতি রাজস্ব আদায়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সচেষ্ট রয়েছে। পরিস্থিতি খুব তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।


Spread the love