যত কম কথা তত বেশি সফলতা

24
Spread the love

ফজলুর রহমান : কবি কুসুমকুমারী দাশ আমাদের শৈশবেই ‘আদর্শ ছেলে’-দের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ছন্দের ছলে তিনি শিখিয়েছেন “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?”
বোধগম্য চিহ্ন, শব্দ,শব্দসমষ্টি বা বাক্যই হলো হলো কথা।  অনেক কথা মিলেই তো জীবন।
এই কথা আমরা কতটুকু কথা বলি-
বেশি?
কম?
না পরিমাণ মতো?
তবে কথার তো সুনির্দিষ্ট কোন পরিমাপক নেই। যদিও কথার কিছু বিশেষ ‘ব্যবহারবিধি’ থাকতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কম কথা বলেন তারা চিন্তা করেন বেশি। আর অনেক ক্ষেত্রেই কথা কম বলে চুপচাপ থাকার অর্থ হচ্ছে তারা মনে মনে চিন্তা করছেন। একটি আলোচনার মধ্যে সবাই যখন কথা বলেন তখন একজন কম কথা বলা মানুষও কথা বলতে আগ্রহী হন, কিন্তু তার কথা বলা শুরু করা বা কিছু বলার প্রধান অন্তরায় হচ্ছে তিনি সকলের কথা শোনেন এবং চিন্তা করতে বেশি পছন্দ করেন। আর এই চিন্তা করার ক্ষমতাটিই কম কথা বলা মানুষকে বুদ্ধিমান করে তোলে।
যারা বেশি চুপচাপ থাকেন এবং কথা কম বলতে পছন্দ করেন তারা বেশি লিখেন এবং বেশি পড়েন। তারা তাদের এনার্জির সবটুকু কোনো গঠনমুলক কাজে ব্যয় করতে চান। তারা সৃজনশীল কাজ করতেও বেশি পছন্দ করেন। আর এতে তাদের বুদ্ধি ধারালো হতে থাকে। যারা বেশি কথা বলেন তাদের মধ্যেই এই বিষয়টি বেশ কম নজরে পড়ে।
এএআরপি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে বলা হয়, ‘কম কথা বলার বিষয়টি মস্তিষ্কের জন্য ভালো। এতে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা সঠিক থাকে এবং কোনো কথা বলার আগে চিন্তা করে নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়’। যারা বেশি চুপচাপ থাকেন তাদের মস্তিষ্ক অনেক দ্রুত কাজ করে এবং তারা নিজেকে শান্ত রেখে অনেক কিছু নিয়ে চিন্তা করে কোনো একটি ব্যাপারে নিজেদের মত প্রকাশ করে থাকেন। আর চিন্তা করে কথা বলার বিষয়টিই বুদ্ধিমান মানুষের পরিচায়ক।
‘সায়েন্টেফিক আমেরিকা’র একটি ইন্টারভিউয়ে ‘কোয়াইট: দ্য পাওয়ার অফ ইন্ট্রোভার্টস’ এর লেখক সুসান কেইন বলেন, অন্তর্মুখী বৈশিষ্ট্য এবং লজ্জার কারণে চুপ থাকার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যারা লজ্জা পান তারা নিজের কথার বিপরীতে নেতিবাচক কিছু ব্যাপারে কথা শুনতে লজ্জিতবোধ করেন বলেই চুপ থাকেন। কিন্তু যারা অন্তর্মুখী স্বভাবের তারা অন্যের কথা শুনে তা নিয়ে ভাবতে এবং শিক্ষা গ্রহণেই বেশি ব্যস্ত থাকেন’। চুপচাপ থাকা মানুষ অন্যের কথা শুনে তা থেকে জ্ঞান নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নতুন কিছু শিখতে নিজেকে প্রস্তুত করে নেন। অপরদিকে কথা বেশি বলা মানুষেরা শুধু উলটো উত্তর এবং একগাদা কথা বলার জন্যই মুখিয়ে থাকেন এবং তেমন কিছুই শেখার চেষ্টা করেন না।
বুঝে শুনে ও স্থান, কাল, পাত্র বিবেচনা করে কথা বলাটা জ্ঞানী ও বুদ্ধিমানের পরিচয় প্রকাশ করে। এক্ষেত্রেও যারা অনেক কম কথা বলেন তারা যতোটুকুই কথা বলুক না কেন অনেক ভেবে চিন্তে বলেন। যারা কম কথা বলেন তারা মস্তিষ্কে তাদের কথা সাজিয়ে তারপর তা মুখে প্রকাশ করে থাকেন। অপরদিকে বেশি কথা বলার মানুষেরা অনেক সময় নিজেরাও সঠিক বুঝতে পারেন না তারা কী কথা বলছেন। সুতরাং এখানেই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়।
এছাড়া একটা প্রবাদ আছে, বোবার কোনো শত্রু নেই! প্রবাদটা একেবারে মিথ্যা নয়। কারণ, যত বেশি কথা, তত বেশি সমস্যা। তাই বলে কথা বলা বন্ধ করে দেবেন?-না। তবে অতিরিক্ত কথা বলার অভ্যাসটা ত্যাগ করতে হবে। না হলে বিপদে পড়তে সময় লাগবে না। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেকে বুঝতেই পারে না যে সে বেশি কথা বলে! আর না বোঝার কারণেই সব সমস্যার সম্মুখীন হয়। এ ক্ষেত্রে আইডিভা ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এই লক্ষণগুলো দেখে বুঝে নিন, আপনি বেশি কথা বলছেন কি না।
১. আপনার মাথায় যখন কোনো কথা ঘুরপাক খায়, তখন আপনি সঙ্গে সঙ্গেই সেটি বলে ফেলেন। সেটা যতই তিক্ত কথা হোক, আপনার মুখে আটকায় না। আপনি যে সৎ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কথা বলার বিষয়ে আপনাকে সচেতন হতেই হবে।
২. আপনার কাছে যখন কেউ সত্যি উত্তর জানতে চায়, তখন আপনি সত্যিটাই বলে দেন। এতে সে কষ্ট পেতে পারেন, সে বিষয়টা আপনি ভুলে যান। মাঝেমধ্যে আপনার সৎ উত্তর অন্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৩. যেকোনো বিষয় আপনার খারাপ লাগলে আপনি সঙ্গে সঙ্গেই দুঃখ প্রকাশ করেন। আবার রাগও লুকাতে পারেন না। কিছু একটা বলে ফেলেন। বেশি কথা বলার অভ্যাসের কারণে এই সমস্যা আপনার হরহামেশাই হয়ে থাকে।
৪. অনেক সময় আপনি চেষ্টা করেন কিছু না বলার, কিন্তু আপনার অভিব্যক্তি ঠিকই প্রকাশ করে দেয়। কারণ, আপনি পেটে কথা রাখতে পারেন না। তাই মুখ চুপ থাকলেও চেহারা ঠিকই কথা বলে।
৫. আপনি হয়তো চুপচাপ বসে আছেন। হঠাৎ কেউ একজন আপনাকে কিছু খেতে বলল আর আপনি সঙ্গে সঙ্গেই সেই খাবার নিয়ে কথা বলা শুরু করে দিলেন। এই যেমন, খাবারটা আপনার খুবই পছন্দ, তবে অন্য ফ্লেভার হলে ভালো হতো কিংবা অনেকক্ষণ ধরেই আপনি এটি খাওয়ার কথা ভাবছেন। এমন হাজারটা কথা বলা শুরু করে দিলেন। বেশি কথা বলার এর থেকে আর বড় লক্ষণ কী হতে পারে।
৬. আপনি যখন নতুন কারো সঙ্গে দেখা করেন, তখন খুব একটা কথা বলার চেষ্টা করেন না। কারণ, আপনি নিজেই নিজেকে ভয় পান। যাতে নতুন মানুষটির সামনে আপনি উদ্ভট কিছু বলে না ফেলেন।
৭. যখন আপনি কোনো বেখাপ্পা কথা বলে ফেলেন, তখন মানুষ আপনাকে নিয়ে মজা করে। তারা ভাবে, আপনি নিছক আনন্দ দেওয়ার জন্যই এমনটা বলেছেন। অথচ আপনি না বুঝেই কথাটা বলে ফেলেছেন। এভাবে বেশি কথা বলতে থাকলে একটা সময় সবাই আপনাকে নিয়ে শুধু মজাই করবে। কখনোই আপনার কোনো কথাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে না।
৮. আপনি সব সময় ভুল সময়ে ভুল কথা বলে বসেন, যা ওই পরিবেশটাকে ঘোলাটে করে ফেলে। তাই সাবধান, বেশি কথা বলার কারণে বিপদে পড়তে পারেন।
৯. বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বেশি কথা বলার কারণে মাঝেমধ্যে আপনি বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন, আবার মাঝেমধ্যে অন্যরা বিরক্ত হন।
১০. বন্ধুদের সঙ্গে থাকলেও আপনাকে সবাই কথা বলতে নিষেধ করে। যখনই দেখবেন কোনো কিছু বলার আগে আপনাকে চুপ থাকতে বলা হচ্ছে, তখনই বুঝবেন আপনার বেশি কথা বলার অভ্যাস আছে।
কম বলার টিপসঃ
গবেষণা মতে, এই উপায় গুলো মেনে চলতে পারলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে মানুষজন আপনাদের সম্মান করা শুরু করবে একজন ভালো শ্রোতা হিসেবে।
১. কেন বেশি কথা বলছেন কারণ খুঁজে বের করুন
বাচালতা পরিহার করুন এবং আপনি এত কথা বলার পিছনের কারণটি খুঁজে বের করে সেটি কিভাবে সমাধান করা যায় সেটি চিন্তা করুন।
২. ভাল শ্রোতা হউন
একজন ভালো বক্তার চেয়ে ভালো শ্রোতা অন্যকে বেশি প্রভাবিত করে। সব সময় বক্তার কথা শুনেই মানুষ প্রভাবিত হয় না। সবাই চায় তার কথা গুলো অন্যকে শোনাতে কিন্তু কেউই শুনতে চায় না। যদি আপনার কথা কম বলার অভ্যাস না থাকে তাহলে দ্রুত এই অভ্যাস আয়ত্ব করে নিন। আর আপনি যখন কারও কথা শুনবেন তখন কথা বলার জন্য তাকেই টাইম দিতে হবে। ফলে আপনি বলার সুযোগ কম পাবেন। মূল কথা হলো ভাল শ্রোতা হউন। তাহলে কথা বলার হারও কমে যাবে। এটি কথা কম বলার উপায় গুলোর মধ্যে একটি সেরা উপায়।
৩. গুরুত্বপূর্ণ হলেই কথা বলুন
কথা বলা শুরুর আগে আপনি নিজেকে প্রশ্ন করুন যার সাথে কথা বলছেন-তাকে ঠিক কোন কথাটি বলতে চাচ্ছেন। আর যা বলতে চাচ্ছেন তা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ সেটাও চিন্তা করে নিন। যদি কথার প্রয়োজনীয়তা এবং শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলোই কথা বলার সময় আমরা বলি তাহলে আমাদের মুখ দিয়ে অযাচিত কথা বের হবে না। সুতরাং কোন কোন কথা, বিষয়, তথ্যগুলো অন্যকে জানানো প্রকৃতপক্ষেই দরকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সে কথা গুলোই বলুন। তাহলে কিছুটা হলেও আপনি বেশি কথা বলার কুফল থেকে রেহাই পাবেন।
৪. কথা বলার উদ্দেশ্য এবং শব্দ চয়ন খেয়াল করুন
কিছু মানুষ খুব দ্রুততার সাথে কথা বলেন। দ্রুততার সাথে কথা বললে আমরা চিন্তা ভাবনা করে কথা বলার টাইম পাইনা। কথা কম বলার অভ্যাস রপ্ত করতে হলে আপনি কি বলছেন, কোন কোন শব্দ উচ্চারণ করছেন সে বিষয়ে আপনাকে সচেতন হতে হবে। কথা কম বলার উপায় গুলোর মধ্যে যদি শুধু এই উপায়টি- মানে কি বলছেন, কাকে বলছেন, বলার সময় কোন কোন শব্দ উচ্চারন করছেন যদি এগুলো মেনে চলতে পারেন, তাহলে আপনি কম কথা বলার অভ্যাস গড়তে পারবেন।
৫. অন্যকে ইম্প্রেস করার জন্য কথা বলা থেকে বিরত থাকুন
সাধারণত কাউকে ইম্প্রেস করার প্রয়োজন হলে আমরা অনেক বেশি কথা বলি। বেশি কথা বলার কুফল যারা জানেন তারা কিন্তু কাউকে ইম্প্রেস করার জন্য অতিরিক্ত কথা বলেন না। তারা যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততোটুকু কথা বলেন। আসলে একটি কথা মনে রাখতে হবে- Show Off করার জন্য অতিরিক্ত কথা বলে কাউকে ইম্প্রেস করলেও সে ইম্প্রেশন বেশি দিন টিকে না। তাই কাউকে ইম্প্রেস করার জন্য বেশি কথা বলছেন কিনা সেদিকে খেয়াল রাখুন।
তাই কেবল ‘কথা’ চলতে পারে, তবে ‘অহেতুক কথা’ ও ‘কথার কথা’ বিপদজনক বা বিব্রতকর বিষয় হতে পারে। মহামতি প্লেটো বলতেন, ‘একটি কথা বলার আগে ১০ বার ভেবে বলো।’ তাই বেশি কথা বলা যাবে না। তবে ন্যায়সংগত কথা বলাও জরুরি। সুতরাং কথামালায় একটি চেক এন্ড ব্যালেন্স থাকতে হবে।  আস্ত জীবনটাই তো চেক এন্ড ব্যালেন্স মেনে চলে!

লেখক, ফজলুর রহমান, রচনা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং সহকারী রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।


Spread the love