সাতক্ষীরায় অপহরণের পাঁচ দিন পর কলেজ ছাত্রের লাশ উদ্ধার : গ্রেফতার ৫ দুই অপহরণকারীর বাড়িতে আগুন

86
Spread the love

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরায় ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণের পাঁচ দিন পর গৌতম সরকার (১৯) নামে এক কলেজ ছাত্রের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার সকালে সদর উপজেলার মহাদেবনগর গ্রামে বাড়ির পাশে একটি পুকুর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ পাঁচ অপহরণকারীকে গ্রেফতার করেছে। এদিকে উত্তেজিত জনতা সকালে দুই অপহরণকারী মহাসিন ও সাজু’র বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। নিহত গৌতম সরকার সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মহাদেবনগর গ্রামের ইউপি সদস্য গণেশ সরকারের ছেলে ও সীমান্ত আর্দশ ডিগ্রী কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। গ্রেফতারকৃতরা হলো সদর উপজেলার ভাড়–খালী গ্রামের আব্দুল করিম মোড়লের ছেলে শাদাত হোসেন (৩৫), একই গ্রামের মৃত রুপচাঁদ গাজীর ছেলে নাজমুল গাজী (২২), মহাদেবনগর গ্রামের মোশরাফ মিস্ত্রির ছেলে মহাসিন মিস্ত্রি (৩৪), একই গ্রামের রেজাউল ইসলাম শেখের ছেলে সাজু শেখ (২৩) এবং দেবহাটার বহেরা গ্রামের আব্দুল আলিমের ছেলে আলী আহম্মেদ ওরফে শাওন (২৩)। ঘোনা ইউপি মেম্বর মোত্তাসিম বিল্লাহ জানান, গত ১৩ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গৌতিম সরকার বাড়ির পাশের একটি চায়ের দোকানে বসে টিভিতে খেলা দেখছিল। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তার ফোনে একটি রিং আসার পর সে উঠে চলে যায়। এরপর তার আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরদিন ১৪ ডিসেম্বর সকালে গৌতমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে তার বাবার কাছে একটি রিং আসে। রিসিভ করার পর অপরপ্রান্ত থেকে বলা হয় “গৌতম আমাদের কাছে আছে। তোর ছেলেকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। এ কথা কাউকে জানালে তোর ছেলেকে কেটে টুকরো টুকরো করে নদীতে ভাসিয়ে দেবো” বলে ফোনটির সুইচড অফ করে দেয়া হয়। এদিন বিকেলে গৌতমের মোবাইল নম্বর থেকে তার বাবার কাছে আবারও ফোন করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। এ ঘটনার পর গণেশ সরকার সন্ধ্যায় সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেন। রাত ৯টার দিকে ফের গণেশ সরকারের কাছে গৌতমের নম্বর থেকে রিং করে টাকা রেডি আছে কিনা জানতে চাওয়া হয়। সে এত টাকা দিতে পারবে না বলে জানিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দিতে রাজি হয়। এ সময় অপহরণকারীরা টাকা নিয়ে রাতে আলীপুর এলাকার একটি চিংড়ি ঘেরের ভেড়ীবাঁধের উপর অপেক্ষা করতে বলে। তবে পুলিশসহ অন্য কাউকে জানালেই বিপদ হবে বলে জানায় তারা। বিষয়টি তিনি (গণেশ) ঘোনা ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান ও সাতক্ষীরা থানার ওসিকে জানিয়ে তাদের সহায়তা চান। সদর থানার সাব-ইন্সপেক্টর আবুল কালামসহ পুলিশের কয়েক সদস্যকে সাথে নিয়ে গণেশ অপহরণকারীদের কথা মতো ১৪ ডিসেম্বর গভীর রাতে নির্দিষ্ট স্থানে টাকা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অপহরণকারীরা ওই স্থান থেকে চলে যায়। এক পর্যায়ে ফোনে অপর প্রান্ত থেকে সাথে থাকা অন্য সব লোককে সরিয়ে দিয়ে টাকা নিয়ে ওই স্থান থেকে শ্রীরামপুর চলে যেতে বলা হয়। পরে বলা হয় টাকা বিকাশ মারফত পাঠাও। এভাবে সারা রাত ধরে তাদেরকে ঘুরানো হয়। পরদিন ১৫ ডিসেম্বর ভোর রাতে ফোন করে টাকা খাসখামার-শ্রীরামপুর এলাকার একটি পরিত্যক্ত মেশিন ঘরে রেখে আসতে বলে অপহরণকারীরা। তাদের কথামত গণেশ সরকার সেখানে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা রেখে এসে সদর থানার এএসআই রইচ ও একজন সিপাহীসহ অন্যান্যদের সাথে নিয়ে দূরে ওৎ পেতে থাকে। গত বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিক শাহাদাত, সাজু ও শাওন ওই টাকা নিতে এলে গ্রামবাসীর সহায়তায় তাদেরকে হাতনাতে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ছয়টি মোবাইল ফোন। পরে সদর থানার এসআই কালামসহ অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে তাদের স্বীকারোক্তি মোতাবেক মহাসিনকে তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। কিন্তু তারা কেউ গৌতমের সন্ধান দিতে পারেনি। সে নাজমুলের কাছে রয়েছে বলার পর পুলিশ গত শুক্রবার রাতে কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা এলাকায় শ্বশুর বাড়ি থেকে নাজমুলকে আটক করে। নাজমুলের দেয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী পুলিশ গতকাল শনিবার সকাল ৮টার দিকে সদর উপজেলার মহাদেবনগর গ্রামে বাড়ির উত্তর পাশে মন্দিরের কাছে একটি পুকুর থেকে গৌতমের লাশ উদ্ধার করে। উত্তেজিত জনতা এ সময় অপহরণকারী মহাসিন ও সাজু’র বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে। গৌতমের বাবা গণেশ সরকার জানান, কয়েক দিন আগে তার এলাকার জামসেদ নামে এক ঘরজামাইকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তাকে ছাড়ানোর জন্য তার ওপর চাপ আসে। গণেশ তাতে সাড়া না দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে জামসেদ ও তার বাহিনী। স্থানীয় আরেক ব্যক্তি আবদুর রহমানের মাধ্যমে পুলিশকে ম্যানেজ করে জামসেদ থানা থেকেই মুক্ত হয়ে ফিরে আসে। এ সময় তাকে হুমকি দিয়ে বলা হয় ‘আমাকে বের করতে সাহায্য করলেন না। এর পরিণতি ভালো নয়’। গণেশ জানান, এর পরই তার ছেলে অপহৃত হয়। জামসেদ অপরাধ জগতের লোক বলে জানান এলাকাবাসী। তাদের সন্দেহ জামসেদ ও শাহাদাত গৌতমকে মুক্তিপণ আদায়ের লক্ষে অন্যদের সহায়তায় অপহরণ করেছিল। সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন জানান, নিহত ছাত্রের লাশ পুলিশ উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় যারা জড়িত থাক তাদেরকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে। নিহতের বাবা বাদী হয়ে ছয় জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো কয়েকজনের নামে সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে।


Spread the love