কারাবন্দী মুফতি রাহমানির নির্দেশে বস্নগার অভিজিৎ ও অনন্ত হত্যা

149
Spread the love

image_2062_260659স্টাফ রিপোর্টার : বিজ্ঞানমনস্ক লেখক-বস্নগার অভিজিৎ রায় ও অনন্ত বিজয় দাশ হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারীসহ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের তিন সদস্যকে গ্রেফতারের দাবি করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-৩। গত সোমবার রাতে রাজধানীর নিউমার্কেট ও ধানমন্ডি থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয় বলে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে র‌্যাব সদর দফতরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছে র‌্যাব। গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছেন- আনসারুল্লাহর অনলাইন কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা সক্রিয় সদস্য সাদেক আলী মিঠু (২৮) অর্থ সরবরাহকারী তৌহিদুর রহমান (৫৮) ও আমিনুল মলি্লক (৩৫)। এর মধ্যে তৌহিদ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক। গ্রেফতারকৃতদের বরাত দিয়ে র‌্যাব জানায়, কাশিমপুর কারাগার থেকে মুফতি রাহমানির নির্দেশে বস্নগার অভিজিৎ ও বস্নগার অনন্তকে হত্যা করে আনসার উল্লাহর একই সস্নিপার সেলের ৬ জঙ্গি। মুফতি রাহমানীর অনুপস্থিতিতে দল পরিচালনা ও অর্থের যোগান দিচ্ছেন এক ব্রিটিশ নাগরিক তৌহিদ। র‌্যাবের জিজ্ষাবাদে ওই জঙ্গিরা জানিয়েছে, কারাগারে বসে জঙ্গি নেটওয়ার্ক চালাচ্ছেন মুফতি রাহমানী। র‌্যাবের দাবি, অভিজিৎ ও অনন্ত হত্যার নির্দেশনাও আসে কারাগার থেকেই। অভিজিৎ হত্যার দু’ঘন্টা আগে পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় মহসিন হলের মাঠে বসে। জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাব জেনেছে, জঙ্গিদের অর্থের যোগানদাতা আটক বাংলাদেশী বংশদ্ভুত ব্রিটিশ নাগরিক তৌহিদ মুলত হত্যাকান্ডের পরিকল্পনাকারী। এদিকে অভিজিৎ হত্যা মামলার তদন্ত করছে ডিবি। আর অনন্ত বিজয় হত্যা মামলার তদন্ত সিআইডির হাতে। অভিজিতের মামলায় এর আগে উগ্রবাদী ব্লগার ফারাবীকে গ্রেফতার করা হয়। অনন্তের মামলায় আটক হয়ে কারাগারে আছেন সিলেটের এক ফটো সাংবাদিক। প্রেস ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, গত সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর নীলক্ষেত থেকে প্রথমে সাদেককে গ্রেফতার করা হয়। পরে, তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাত সাড়ে ১২টার দিকে ধানমন্ডির স্টার কাবাবের সামনে থেকে তৌহিদুর ও আমিনুলকে গ্রেফতার করা হয়। র?্যাবের ওই কর্মকর্তার দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তৌহিদ ও সাদেক অভিজিৎ ও অনন্ত হত্যায় পরিকল্পনা ও হত্যাকান্ডে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান জসিমউদ্দিন রহমানীর কাছ থেকে হত্যার নির্দেশনা পেতেন সাদেক ও তার ছোট ভাই আবুল বাশার। সেই অনুযায়ী তৌহিদুর হত্যার পরিকল্পনা করতেন। আর সাদিকসহ আরও চারজন হত্যাকান্ডে অংশ নিতেন। র‌্যাব কর্মকর্তা মুফতি মাহমুদ খানের ভাষ্য, অভিজিৎ হত্যাকান্ডে রমজান, নাঈম, জুলহাস, জাফরান ও সাদিক অংশ নেন। এর মধ্যে শুধু সাদেক গ্রেফতার হয়েছে। বাকিরা পলাতক রয়েছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অভিজিৎকে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকান্ডের তিন ঘণ্টা আগে মুহসীন হলের মাঠে ওই পাঁচজন জড়ো হন। সেখানে দেড় ঘণ্টার বৈঠক শেষে রমজান ও নাঈম বইমেলায় গিয়ে অভিজিৎকে অনুসরণ করেন। পরে অভিজিৎকে তারা কুপিয়ে হত্যা করেন।
পরিকল্পনা জেলখানায়, জানতেন রাহমানি : র‌্যাব কর্মকর্তা মাহমুদ জানান, জেলখানা থেকে বস্নগারদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। বর্তমানে কাশিমপুর কারাগারে থাকা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সংগঠক জসিম উদ্দিন রাহমানি বস্নগারদের হত্যার পরিকল্পনার কথা জানতেন। তিনি ওই পরিকল্পনার কথা নিজের ছোট ভাই আবুল বাশারের মাধ্যমে সংগঠনের অপর সদস্যদের জানাতেন। যেভাবে তারা জঙ্গিবাদে : র‌্যাব জানায়, ‘তৌহিদুর যুক্তরাজ্য প্রবাসী ও একজন আইটি বিশেষজ্ঞ। ৯০’র দশকে তৌহিদুর যুক্তরাজ্যে যান এবং আইটি বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। পরবর্তী সময়ে জসিম উদ্দিন রাহমানির মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে জড়িয়ে পড়ে। রহমানির অনুপস্থিতিতে সংগঠনের সার্বিক আর্থিক ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করছিল সে।’ গ্রেফতারদের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য উল্লেখ করে কমান্ডার মুফতি মাহমুদ বলেন, ‘অভিজিৎ ও অনন্ত বিজয়ের সকল কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং তাদের গতিবিধির উপর নজর রাখতেন তৌহিদুর। সাদেকের সঙ্গে রাহমানির পরিচয় হয় ২০০৭ সালে। এরপর থেকে সেও এ সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এবং ২০১২ সাল পর্যন্ত রাহমানির স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। সাদেক ২০১১ সাল থেকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সক্রিয় সদস্য হওয়ার পর সে কাশিমপুর কারাগারে গিয়ে সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমের দিকনির্দেশনা নিয়ে আসত।’ মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক আরও বলেন, ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের যে সকল সদস্য আত্মগোপনে ও পালিয়ে দেশের বাইরে যেতে চায় তাদের বিভিন্ন নামে পাসপোর্ট তৈরি করে দিত আমিনুল। রহমানি জেলে থাকা সময়ে সাদেক ও তার আপন ছোট ভাই আবুল বাশার বিভিন্ন হত্যাকান্ডের দিকনির্দেশনা দিত। দিকনির্দেশনা মোতাবেক পরবর্তী সময়ে তৌহিদুর হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা করত।’
অভিজিৎ হত্যা : গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বস্নগার ও লেখক অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। রাত সোয়া ৯টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশে দুর্বৃত্তরা অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী নাফিজা আহমেদকে কুপিয়ে জখম করে। আহত অবস্থায় তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত সাড়ে ১০টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অভিজিৎ। অভিজিৎ ও তার স্ত্রী দু’জনই আমেরিকাপ্রবাসী ছিলেন। তিনি মুক্তমনা বস্নগের প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক। তার লেখা নয়টির বেশি বই রয়েছে। অভিজিৎ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অজয় রায়ের ছেলে। এ হত্যা মামলাটি ডিবি পুলিশ তদন্ত করছে। আর অভিজিত মার্কিন নাগনিক হওয়ায় হত্যা মামলা তদন্ত করতে বাংলাদেশে এসেছিল মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এর একটি দল। তারা অবিজিত হত্যা তদন্তে ডিবি পুলিশকে কারিগরি সহায়তা দিয়েছিল। ওই হত্যাকান্ডের আলামতও পরীক্ষার জন্য আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তবে এ পর্যন্ত পরীক্ষার রিপোর্ট ডিবি পুলিশকে হস্তান্তর করেনি এফবিআই।
অনন্ত বিজয় হত্যা : গত ১২ মে সিলেট নগরের সুবিদ বাজার এলাকায় অনন্ত বিজয় দাশ নামের লেখক ও বস্নগারকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। সকালে অনন্ত সুবিদ বাজার এলাকায় তার বাসা থেকে বের হওয়ার পর দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে অনন্তকে গুরুতর জখম করে। ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। অনন্ত মুক্তমনা লেখক ও ব্লগার ছিলেন। বিভিন্ন সময় তিনি বস্তুবাদ ও যুক্তিবাদ নিয়ে ব্লগে লিখতেন। এ নিয়ে তার কয়েকটি বই রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত বিজ্ঞান মনস্ক লেখক অভিজিতের একটি বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন অনন্ত। এ ছাড়া ‘যুক্তি’ নামের একটি সাময়িকিও সম্পাদনাও করতেন তিনি।


Spread the love