স্বাস্থ্য সেবা ঝুকিতে মণিরামপুরের সাড়ে ৪ লক্ষাধিক মানুষ

76
Spread the love

তাজাম্মূল হুসাইন, মণিরামপুর (যশোর) : চিকিৎসক সংকট, অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছে যশোরের মণিরামপুর হাসপাতালটি। সাড়ে চার লক্ষাধিক জনগণের ৫০ শয্যা এই হাসপাতালটি চিকিৎসা সেবা নিয়ে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। ২৬ জন চিকিৎসকের স্থলে ১৫ জন থাকলেও দু’জন রয়েছেন ডেপুটেশনে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালটির কর্মকর্তাসহ দু’জন রয়েছে প্রশিক্ষণে। কাগজে-কলমে অন্য যে ক’জন রয়েছেন তাদের আসা-যাওয়াও চলে নিতান্তই মর্জির উপরে। সব চেয়ে ভয়াবহ অবস্থা স্যানিটেশন বিভাগ নিয়ে। এ বিভাগে যিনি দায়িত্বে আছেন বেশীর ভাগ সময় কাটে তার অবৈধ ভাবে উপার্জন নিয়ে। ফলে স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে নাকাল মণিরামপুরবাসী।
সরেজমিন মঙ্গলবার হাসপাতালে অনুসন্ধান করে মিলেছে এসব তথ্য। এ দিন ভারপ্রাপ্ত হিসেবে টিএইচ এর দায়িত্বে ছিলেন ডাঃ শরিফুজ্জামান রঞ্জু। হাসপাতারের টিএইচ এ ডাঃ দিলীপ কুমার রায় প্রশিক্ষনে রয়েছেন ঢাকাতে। এটুকু বলেই মাত্র শেষ করেন তিনি। অন্য বিষয়ে জানতে চাইলে কোন কিছুই বলতে নারাজ তিনি। সকাল ১০টায় যথারীতি উপস্থিত থাকলেও বাকী অনেকেই আসেননি। জরুরী বিভাগে দায়িত্বে ছিলেন ডাঃ রেহে নেওয়াজ। হাসপাতালে উপস্থিত অনেকেই জানান, এখানে ডেন্টালের চিকিৎসক ডাঃ আব্দুলাহ আল মামুন আসেননা অনেক দিন থেকেই। এ সময় কৌতুহল বসত: সাংবাদিক বাবুল আকতার বললেন, এসব নিয়ে কেউ লিখতে চাননা। সহকারী মেডিকেল হিসেবে এ দপ্তরটি চালান আব্দুর রউফ। সকাল ১০টার পর দপ্তরে আসেন ডাঃ অরূপ জ্যোতি ঘোষ। তিনি স্থানীয় ছেলে হওয়ায় নিয়মিত আসেন বলে সংশ্লিষ্ট অনেকেই জানিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে হাসপাতাল আবাসিকে থাকেন না কোন চিকিৎসক। চিকিৎসকদের অধিকাংশই থাকেন যশোর জেলা শহরে। মাত্র দু’জন চিকিৎসক আসেন পাশের উপজেলা কেশবপুর থেকে। যে কারণে রোগীরা সময় মতো পাননা চিকিৎসকদের। এ ছাড়াও উপজেলার কোন কমিউনিটি সেন্টার গুলোতে ঠিক মতো দায়িত্ব পালন করেননা, সেখানে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকরা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাসপাতালে প্রধান কর্মকর্তা ডাঃ দিলীপ কুমার, ডাঃ আমিরুজ্জামান রয়েছেন ঢাকায় প্রশিক্ষনে। সহকারী সার্জন ডাঃ রাজিব পাল, ডাঃ হুমাইরা আশরাফি রয়েছেন ডেপুটিশনে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ডাঃ অনুপ বসু, মার্জিয়া আক্তার, জহিরুল হক, মাহমুদুল ইসলামকে এ দিন দেখা মেলেনি তার হাসপাতাল দপ্তরে। হাসপাতালের অফিস সহকারী প্রধান অশোক কুমার ঘোষ জানান, সবাই আসবেন। তবে চিকিৎসক স্বল্পতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ২৬ জন ডাক্তারের স্থলে কাগজে কলমে রয়েছেন ১৫ জন চিকিৎসক। এর মধ্যে ডেপুটেশন এবং প্রশিক্ষনে থাকায় সংকটাবস্থা চলছে। নাম প্রকাশ না শর্তে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অনেকেই জানান, টিকিট নিয়ে সেই সকাল থেকে বসে আছি, ডাক্তার কখন আসবেন তা আল্লাই জানেন।হাসপাতালে ভর্তি রোগী উপজেলার গোপালপুর গ্রামের আরাফাত রহমানের (৪) সংগে থাকা দাদি আয়রা বেগম জানান, গত দু’দিনে হাসপাতাল থেকে একটা বড়ি ঔষুদও দেয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমনিই অভিযোগ করেছেন হাসপাতারে ভর্তি থাকা অনেকেই। তবে লাউড়ি গ্রামের বয়োবৃদ্ধ আজিবর সরদার (৮০) শ্বাস কষ্ট জনিত কারণে ভর্তি হয়েছেন ১৪/১৫ দিন আগে। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, অষুধ যাই দিক ৩ বেলা খাতি দেচ্ছে, এইডা আমার জন্য ভালো। ভর্তি থাকা ১৪/১৫ দিন হলেও স্ত্রী-সন্তানরা এ পর্যন্ত কোন দিন দেখতেও আসেনি আমাকে। ফলে ৩ বেলা দু’মুঠো খাচ্ছি এইডা আমার জন্য যতেষ্ট। জোড়া তালিতে চলছে রোগী বহন করা অ্যাম্বুলেন্সটি। এ ছাড়া অধিকাংশ রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়না হাসপাতালে। ছিলিপ ধরিয়ে দিয়ে পাঠানো হয় মনিরামপুর পৌর শহরের ক্লিনিক গুলোতে। খোজ নিয়ে জানা গেছে, টিএইচএ ডাঃ দিলীপ কুমারসহ হাসপাতালের ২/৩ জনের নিজস্ব ক্লিনিক রয়েছে মণিরামপুর পৌর শহরে। ফলে রোগীদের জিম্মি করে পরীক্ষার নামে গলাকাটা ব্যবসাও করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে সাধারণ কোন রোগী অভিযোগ করলেই খড়গ নেমে আসে তার উপর। সংবাদ প্রতিদিনের স্থানীয় প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম তার মেয়ে শোভাকে নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিকট যান গত ১৫ জুন। টিকিট নিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাড়িয়ে থাকা জাহাঙ্গীর অনুমতি নিয়ে এক চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করেন। দেখতে পান ফোন-আলাপে ব্যস্ত তিনি। এ সময় জাহাঙ্গীর কথা বললেই চিকিৎসক ক্ষীপ্ত হন তার প্রতি। এ পর্যায়ে জাহাঙ্গীরকে পুলিশ দিয়ে  আটক করানো হয়। অবশেষে স্থানীয় সংবাদ কর্মীরা সেখানে পৌছুলে পুলিশ তাকে ছেড়ে দেন।
নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে হাসপাতাল আওতাধীন স্যানিটেশন বিভাগটি নিয়ে। স্যানিটেশনের দায়িত্বে রয়েছেন স্যানিটারী ইন্সপেক্টর নাজনীন নাহার নামে এক মহিলা কর্মকর্তা। বাড়ী শার্শা উপজেলায় হলেও বসবাস করেন যশোর জেলা শহরে। খোজ নিয়ে জানা গেছে কাগজ-কলম ঠিক রেখে তিনি অফিস করেন মাত্র সপ্তাহে ২/৩ দিন। এ ২/৩ দিনে তিনি লাইসেন্স নবায়নসহ বিভিন্ন কাজ কর্ম করলেও সেটি ব্যবসায়ীদের জন্য বিষফোড়া হয়ে দাড়িয়েছে। অভিযোগে জানা গেছে, হোটেল রেস্ট্রুরেন্ট গুলোর বার্ষিক লাইসেন্স নবায়ন করতে লাগে মাত্র ১’শ টাকা। এ ক্ষেত্রে তিনি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার পর্যন্ত আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া খাবারের দোকানে মালিক ও কর্মচারীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে ১’শ টাকার স্থলে ১ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পৌর শহরের কয়েকজন বেকারী ও হোটেল-রেষ্ট্রুরেন্টের মালিক জানিয়েছেন, স্যানেটারী ইনেসপেক্টর নাজনীন নাহার মহা দূর্নীতিবাজ। তার চাহিদা মতো টাকা না দিয়ে কেউ রক্ষা পাচ্ছে না। খোজ নিয়ে জানা গেছে উপজেলার ৫৬টি হাট-বাজারে প্রায় অর্ধশতাধিক বেকারী এবং ১০/১২টি খাদ্য উৎপাদন কারখানা রয়েছে। এ ছাড়া ১০৫টি হোটেল রেস্ট্যুরেন্ট রয়েছে। এ সব হোটেল-রেষ্ট্রুরেন্ট এবং খাদ্য উৎপাদন কারখানায় শ্রমিক রয়েছে ১৭০ জন। হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি রজব আলী এবং সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের কাজ করাতে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা সনদ লাগে। এ সনদ নিতে স্যানিটারী ইনেসফেক্টর নাজনীনকে গুনতে হয় মোটা অংকের টাকা। এ ছাড়াও মাংস ব্যবসায়ীরাও রয়েছে এই বিড়াম্বনার আওতাধীন। খোজ নিয়ে জানাগেছে, উপজেলার ৫৬টির হাট-বাজারে রয়েছে প্রায় দেড় শতাধিক বৈধ-অবৈধ মাংস ব্যবসায়ী (কসাই)। যাদের সনদ নিতেও মোটা অংকের টাকা গুনতে হয় বলে  জানাগেছে।  এসব ব্যাপারে কথা বলার চেষ্টা করা হলে স্যানেটারি ইন্সপেক্টর নাজনীন নাহারের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায় গত দু’দিন। হাসপাতালের এসব অনিয়ম, দূর্নীতির বিষয়ে কথা বলার জন্য টিএইচএ (থানা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা) ডাক্তার দীলিপ কুমার রায়ের ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডাক্তার শরীফুজ্জামান রঞ্জুকে জানাতে চাইলে তিনি জানান, খন্ডকালীন সময় দায়িত্ব পালন করছি ওই সব অভিযোগ বিষয়ে কিছুই বলতে পারবো না আমি। তবে টিএইচএ ডাক্তার দীলিপ কুমার রায় কর্মস্থলে যোগ দেয়ার পর বিষয়টি অবহিত করবো তাকে। এ বিষয়ে কথা বললে সিভিল সার্জন যশোর, ডাক্তার শাহাদাত হোসেন জানান, কোন অভিযোগের লিখিত পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। তবে এ মূহুর্তে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবো আমি।


Spread the love