সড়কে মৃত্যুর মিছিল ও আইনের প্রয়োগ

109
Spread the love

Atik Nogoriআতিকুর রহমান নগরী : ইদানিং যে খবরটি দেশের মানুষকে ব্যথিত করছে তা হল সড়ক দূর্ঘটনা। আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের জন্য এটা নিত্যদিনের ঘটনায় রূপ নিয়েছে বললে মনে হয় ভুল হবে না। মানুষের বাঁচা-মরা আল্লাহর হাতে। কবে, কার, কোথায়, কীভাবে মৃত্যু হবে কেউ জানে না। তদুপরি মানুষ স্বভাবগতভাবে বেশিদিন বাঁচার আশা করে। ভালভাবে বাাঁচার উপায়-উপকরণ খুঁজে। ঝুঁকিপূর্ণ জীবন যাপন করতে কেউই চায় না। পরিবারকে ঝুঁকিহীন রাখা যেমন অভিভাবকের দায়িত্ব ও কর্তব্য, ঠিক তেমনিভাবে দেশকে ঝুঁকিহীন রাখাও সরকার মহোদয়ের দায়িত্ব।
বাংলাদেশের মত আরো দেশ রয়েছে বিশ্বের মানচিত্রে। সেসব দেশে জনগণের প্রাণ সড়ক দূর্ঘটনায় হারানোর সংবাদ তেমন একটা শুনা যায় না। কেন? নিশ্চয় তাদের রয়েছে নিরাপদ ও ঝুঁকিহীন সড়ক। আর আমাদের ঝুঁকিপূর্ণ-নিরাপদহীন সড়ক আছে বলেই দেশের জনগন দূর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে নতুবা পঙ্গুত্ব বরণ করছে। সড়ক সংস্কারের জন্য কোটি টাকা বরাদ্ধ দেয়ার পরও ভাঙ্গা সড়ককে চাঙ্গা করার জন্য সড়কের গর্তকে বালু দ্বারা ভর্তি করা হয়। কিছুদিন পর সেসব বালু সরে গিয়ে সড়ক তার পুরনো অবস্থায় আবারো চলে যায়।
জাতিসংঘের যেসব সদস্য দেশ ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছিল, সে তালিকায় বাংলাদেশও আছে। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা না কমে বরং প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী গত বছর ছয় হাজার ৫৮১টি সড়ক দুর্ঘটনায় আট হাজার ৬৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে প্রতিদিন ২৪ জনের মৃত্যুর হিসাব দিয়েছে সংগঠনটি। অবশ্য পুলিশের হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান গড়ে ছয়জন। সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় বাংলাদেশ সই করলেও সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মপরিকল্পনা নেই বাংলাদেশের। কিছু সড়কের বাঁক সোজা করা ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বাইরে কোনো উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়। চালকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও যানবাহনের ফিটনেসের দিকে কোনো দৃষ্টি আছে বলে মনে হয় না।
চলিত মাসের ৯ জানুয়ারি শনিবার সকালে বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঘন কুয়াশায় একটি গাড়ির ওপর আরেকটি গাড়ি আছড়ে পড়েছে। অন্তত ২০টি গাড়ি দুর্ঘটনাকবলিত হয় সেখানে। নিহত হন ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের ছেলেসহ অন্তত সাতজন। একই দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় আরো ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
বলার উপেক্ষা রাখেনা যে, দেশের যোগাযোগব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে যানবাহনের সংখ্যও বাড়ছে। দৃষ্টিনন্দন আধুনিক যানবাহন যেমন বিভিন্ন সড়কে চলাচল করছে, তেমনি ফিটনেসবিহীন যানবাহনও যে অবাধে সড়কজুড়ে চলাচল করছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এসব গাড়ির চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ আছে, এ কথাও নিশ্চিত করে বলা যাবে না। একদিকে রাজনৈতিক বিবেচনা, অন্যদিকে লাইসেন্স প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ আছে। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে প্রশিক্ষণহীন চালকদের হাতে ড্রাইভিং লাইসেন্স ধরিয়ে দেওয়া হয়। আবার ক্ষেত্রবিশেষে রাজনৈতিক কিংবা সাংগঠনিক চাপের মুখে যে অনেক লাইসেন্স দিতে হয় না, তা নয়। ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরির কারখানাও তো আছে সারা দেশে। একটি পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ৬১ শতাংশ চালক পরীক্ষা না দিয়ে লাইসেন্স নিচ্ছেন, অন্যদিকে দেশের ১৬ লাখ চালক বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছেন। এমন ঘটতে থাকলে সড়ক দুর্ঘটনা নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে এটাই তো স্বাভাবিক!
যেসব কারণে সড়ক দূর্ঘটনা হয়ে থাকে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নিম্নোক্ত কারণ সমূহঃ
১.    ভূঁয়া ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী চালক।
২.    অপ্রাপ্ত বয়স্ক ড্রাইভার।
৩.    হেলপার-হেন্ডুমেন দিয়ে গাড়ী চালানো।
৪.    ট্রাফিক আইন মেনে না চলা।
৫.    প্রতিযোগীতামূলক গাড়ী ড্রাইভ করা।
৬.    পর্যাপ্ত পরিমাণে রেইস ব্রেকার না থাকা।
৭.    চোখে ঘুম নিয়ে গাড়ী চালানো।
প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। একেকটি মৃত্যু একেকটি পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদে অসহায়ত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অপমৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আমরা চাই প্রশিক্ষিত চালকরা সত্যিকারের ফিটনেস সনদ পাওয়া যানবাহন চালাবেন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কঠোর হবে। আইনের প্রয়োগে কোনো বাধা আসবে না। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল আর আমরা দেখতে চাই না। তাছাড়া প্রতিটি থানা-সদরে চলাচলকারী গাড়ীর সখ্যা নিয়ন্ত্রণহীন। যানবাহন চলাচলে মানা হচ্ছে না কোনো নিয়ম-কানুন। তাই দূর্ঘটনাও দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দূর্ঘটনা যেন এ দেশের সড়কের আপন বন্ধু। মৃত্যু আর পঙ্গুত্ববরণ যেন জনগণের প্রাপ্য বখশিস। তাই, এসকল রোড পারমিটবিহীন ও ভূঁয়া ড্রাািিভং লাইসেন্সধারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণই হচ্ছে সময়ের একান্ত দাবী।
লেখকঃ প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট,


Spread the love