১৪ ঘণ্টা পুলিশী হেফাজত থেকে এসপি বাবুল বাসায়

76
Spread the love

vfcনিজস্ব প্রতিবেদক : স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশী হেফাজতে স্বামী পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এরপর তিনি রামপুরার বনশ্রীর বাসায় ফিরে যান। গতকাল শনিবার বিকেল ৪টা ১৯ মিনিটে বাবুল আক্তারের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে কথা বলে এ তথ্য জানা যায়। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমাকে কেউ গ্রেফতার করেনি। যেহেতু মামলার বাদী আমি, তাই এই মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে আলোচনার জন্য আমাকে ডাকা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে কথা হয়েছে।’ গত শুক্রবার রাত দুইটা থেকে গতকাল শনিবার বিকেল চারটা পর্যন্ত ১৪ ঘণ্টা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এর আগে গত শুক্রবার দিবাগত রাত পৌনে দুইটার দিকে রামপুরার বনশ্রীর শ্বশুরের বাসা থেকে বাবুল আক্তারকে নিয়ে যান মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার আনোয়ার হোসেন ও খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঈনুল ইসলাম। অপরদিকে মিতু হত্যাকাণ্ডের রহস্য খুব শিগগির উন্মোচন হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কমিশনার ইকবাল বাহার। মিতু হত্যা মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে গতকাল শনিবার সকালে তিনি বলেন, আরেকটু ধৈর্য্য ধরুন। শিগগিরই রহস্য উন্মোচন হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও হত্যায় সরাসরি অংশ নেয়া খুনিদের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে। এদিকে জঙ্গি দমন অভিযানের জন্য আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারকে গভীর রাতে ঢাকায় তার শ্বশুরবাড়ি থেকে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। বাবুল আক্তারকে গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে রাখা হয় বলে শোনা গেলেও এ বিষয়ে মুখ খোলেননি পুলিশের কোনো কর্মকর্তা। মাদকের অপব্যবহার ও পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে সকালে ঢাকা ক্লাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল সাংবাদিকদের বলেন, (মিতু হত্যার) ঘটনাটি দুঃখজনক। আমরা কনফিডেন্ট যে তাদের (দোষী) ধরতে সক্ষম হয়েছি। এসপি বাবুলকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না, বা তাকে কেন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এ প্রশ্নে মন্ত্রীর উত্তর, এখনও বলার সময় হয়নি। শিগগিরই জানতে পারবেন। বাবুল আক্তারকে কেন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাবুল আক্তার একজন পুলিশ কর্মকর্তা। ওই এলাকার অনেককেই তিনি চেনেন, যাদের আটক করেছি তাদের কনফার্ম করার জন্য বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অন্যদিকে বাবুল আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে তার স্বজনদের মধ্যে তৈরি হয় সন্দেহ আর উদ্বেগ। এ বিষয়ে গতকাল সকাল থেকে জানতে চাইলে পুলিশের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাঁকে কেন নেওয়া হয়েছে, কোথায় নেওয়া হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে কি না এসব প্রশ্নে পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নিশ্চুপ থাকেন। এর মধ্যে একাধিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, স্ত্রী মাহমুদা খুনের ঘটনায় বাবুল আক্তারকে পুলিশের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এসপি বাবুলের বাবা ও শ্বশুর বলেছেন, বাবুলের স্ত্রী খুন হওয়ার পর থেকে পুলিশ নিরাপত্তা দিয়ে এসেছে, কিন্তু এখন তারাও সহযোগিতা ‘করছেন না’। শ্বশুর মোশাররফ হোসেন বলছেন, গত শুক্রবার রাত ১টার দিকে তাদের বনশ্রীর বাসা থেকে বাবুল আক্তারকে নিয়ে যায় মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার আনোয়ার হোসেন ও খিলগাঁও থানার ওসি মঈনুল হোসেন। আইজি সাহেব দেখা করতে বলেছেন বলে ওকে নিয়ে গেল। এরপর তার সাথে আর যোগাযোগ করতে পারছি না। যারা নিয়ে গেল তাদের সাথেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরীর ও আর নিজাম রোডের বাসার অদূরে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় খুন হন। মোটরসাইকেলে করে আসা তিন হামলাকারী মিতুকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে পালিয়ে যায়। চট্টগ্রামের পুলিশ বলে আসছিল, গত দুই বছরে চট্টগ্রামে জঙ্গি দমন অভিযানে বাবুলের ভূমিকার কারণে জঙ্গিদেরই সন্দেহের তালিকায় প্রথমে রেখেছেন তারা, সেভাবেই মিতু হত্যার তদন্ত করছেন তারা। মিতু হত্যার ঘটনায় চট্টগ্রামে যে মামলা হয়েছে, বাবুল আক্তারই তার বাদী। সে কারণে প্রায়ই তাকে পুলিশের কার্যালয়ে প্রায়শ যেতে হত বলে জানান মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, আগেও ও রাতে গেছে। কিন্তু যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে এমন হয়নি। এ কারণে আমাদের সন্দেহ হচ্ছে। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দিচ্ছে না কেন? ফোন বাজছে, ধরছে না কেন? বাসায় দুই বাচ্চা কাঁদছে, মা তো আর নেই। স্ত্রী খুন হওয়ার পর থেকে দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় শ্বশুর বাড়িতেই থাকছিলেন এসপি বাবুল আক্তার। তার শ্বশুর মোশাররফ হোসেন অবসরে গিয়েছিলেন পুলিশের ওসি হিসেবে। আর বাবা আবদুল ওয়াদুদ মিয়াও চাকুরি করেছেন পুলিশে। গত শুক্রবার রাতে বনশ্রী থেকে যখন বাবুল আক্তারকে নিয়ে যাওয়া হয়, তার বাবাও তখন ওই বাসায় ছিলেন। তিনি বলেন, সন্ধ্যায় অফিসার্স ক্লাবে একটা অনুষ্ঠান ছিল। সেখানে যাওয়ার পর বাবুল জানায়, আইজি সাহেবের সাথে দেখা করবে। দেখা করার পর অনুষ্ঠান হয়েই বাসায় আসে ওরা। ওসি সাহেবও (মঈনুল হোসেন) তখন সঙ্গে ছিলেন। রাত পৌনে ১টার দিকে সবাই বাসায় ফিরল। কিছুক্ষণ পর ডিসি সাহেব (আনোয়ার হোসেন) আসেন এবং আইজি সাহেব দেখা করতে বলেছেন জানিয়ে বাবুলকে নিয়ে যান। ওয়াদুদ মিয়া বলেন, আমার ছেলের সাথে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারছি না। আগে ওসি সাহেব একবারেই ফোন ধরতেন, আমাদের নিরাপত্তার খোঁজ খবর নিতেন। এখন ফোনই ধরছেন না। ডিবি অফিসেও যোগাযোগ করেছি, কেউ কোনো সহযোগিতা করছে না, বলছে, উপরের অফিসাররা বলতে পারবে। এদিকে পুলিশের অভিযান চলমান থাকলেও নতুন কাউকে গ্রেফতার বা অগ্রগতির বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা গণমাধ্যম কর্মীদের সামনে মুখ খুলছিলেন না। অবশ্য ‘কয়েক দিনের মধ্যে’ রহস্য উন্মোচিত হবে বলে তারা আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে পুলিশের বিভিন্ন সংস্থা চার-পাঁচজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও সাংবাদিকদের কাছে তাদের কারও পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। অপরদিকে চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার ইকবাল বলেন, হত্যাকান্ড সম্পর্কে পুলিশ পুরোপুরি অবগত। ৯ ভাড়াটে খুনি দিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫ খুনি পুলিশের কব্জায় রয়েছে। আর এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় রয়েছে একজন। পুলিশের কব্জায় থাকা খুনিরা কারা এ ব্যাপারে তিনি বিশদ কিছু বলতে রাজি হননি। তবে হত্যাকাণ্ডের পর সিসিটিভি ফুটেজে দেখা মোটরসাইকেল মালিক আবদুর রহিম, মাইক্রোবাস চালক জানে আলম, মনির, আবু নসর গুন্নু, শাহজামাল রবিন পুলিশের কব্জায় রয়েছে। কিন্তু পুলিশ বিভিন্ন সময়ে এদের কাছ থেকে মিতু হত্যাকাণ্ডের কোনো তথ্য বা সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ার কথা বলেছিল। আর যদি ওই পাঁচজন না হয় তাহলে পুলিশের কব্জায় নতুন করে কারা আছে, তা নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতার মূল পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে নগর পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে বলেন, ‘আমরা শিগগিরই এ ব্যাপারে আপনাদের ভালো খবর দিতে সক্ষম হব। এ জন্য আরেকটু ধৈর্য্য ধরতে হবে।’ ইকবাল বাহার বলেন, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন ও এর পরবর্তী অবস্থার পুরো চিত্র এখন পুলিশের হাতে এসে গেছে। শিগগিরই এই হত্যারহস্য উন্মোচিত হবে জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন ‘জাস্ট ওয়েট এ্যান্ড সি।’ এ ব্যাপারে নগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেও নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কোনো কোনো কর্মকর্তা এ ব্যাপারে কোনো কথাই বলতে নারাজ। এমনকি মিতু হত্যাকাণ্ডে জঙ্গি সম্পৃক্ততার বিষয়টিও এখন বলছেন না কোনো পুলিশ কর্মকর্তা। গত দুই-এক দিন ধরে চট্টগ্রামে গুঞ্জন চলছে, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী এক নেতা এ হত্যাকাণ্ডে মূল পরিকল্পনায় রয়েছেন। যিনি বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোঃ কামরুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, মিতু হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনের দ্বারপ্রান্তে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী, হত্যাকারী এবং তাদের সহযোগীদের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এদের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি স¤পৃক্ত পাঁচজন এখন পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। অতিরিক্ত কমিশনার জানান, মিতু হত্যাকাণ্ডের পুরো পরিকল্পনা একজন মাত্র ব্যক্তি করেছেন। আর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে ভাড়াটে খুনিরা। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছে চারজন এবং পাঁচজন আশপাশে অবস্থান নিয়ে সহায়তা করেছে। এ ছাড়া মিতুকে হত্যা করতে কমপক্ষে পাঁচ দফা চেষ্টা চালিয়ে সাত দফায় হত্যাকারীরা সফল হয়েছে বলে পুলিশ তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে। এদিকে মিতু হত্যায় সরাসরি জড়িত সন্দেহে আবু মুছা (৪৫) ও এহতেশামুল হক ভোলা (৩৮) নামে দুই ব্যক্তিকে ইতোমধ্যেই আটক করেছে পুলিশের একটি ইউনিট। এরা দু’জনই এসপি বাবুল আক্তারের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। ধারণা করা হচ্ছে, তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভাড়াটে খুনি হিসেবে তারা মিতুকে হত্যা করেছে অথবা সাহায্য করেছে। তাছাড়া মিতু হত্যায় যে অস্ত্রটি ব্যবহার হয়েছে, সেটি নাকি বাবুল আক্তরের সোর্স বিভিন্ন সময় ভাড়া দিতো। এর মধ্যে আবু মুছা দুর্র্ধষ সন্ত্রাসী। অনেক সময় ভাড়াটে খুনি হিসেবেও কাজ করেন। এসপি বাবুল আক্তারের হাতে একবার গ্রেফতারও হয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে ভোলাও একজন সন্ত্রাসী ছিলেন। এখন তিনি ৩৫ নম্বর বকশিরহাট ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি। তার বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক মামলা। বেশ কিছুদিন ধরে দু’জনই বাবুল আক্তারের সোর্স হিসেবে কাজ করছেন। আর এসব বিষয় নিয়েই ডিবি পুলিশ বাবুল আক্তারের সঙ্গে কথা বলবে বলেই জানা গেছে।


Spread the love