তাজমহলের নির্মাণশৈলীতে তৈরি তেঁতুলিয়া শাহী মসজিদ

136

১৮০০ শতকের মুসলিম স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন সাতক্ষীরার তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া শাহী জামে মসজিদ। প্রায় দেড় শ’ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক মসজিদটি স্থানীয়ভাবে মিয়ার মসজিদ হিসেবে পরিচিত। আসল নাম খান বাহাদুর কাজী সালামতউল্লাহ জামে মসজিদ হলেও বর্তমানে এটি তেঁতুলিয়া শাহী জামে মসজিদ নামেই পরিচিত।
আগ্রার তাজমহলের অপরূপ নির্মাণশৈলীকে সামনে রেখে মুসলিম স্থাপত্যশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন এই তেঁতুলিয়া মসজিদ। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে সালাম মঞ্জিলের প্রতিষ্ঠাতা ব্রিটিশ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট জমিদার কাজী সালামতউল্লাহ মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে । সিকান্দার আবু জাফর সড়কের পূর্ব পাশে অবস্থিত মসজিদটিতে ৭টি দরজা রয়েছে। প্রতিটি দরজার উচ্চতা ৯ ফুট এবং প্রস্থ ৪ ফুট । দরজার ওপর রয়েছে বিভিন্ন রঙের কাচের ঘুলঘুলি । ভিতরে রয়েছে দুটি পিলার । ১০ বর্গফুট বেড় বিশিষ্ট ১২টি পিলারের ওপর মসজিদের ছাদ নির্মিত। চুনসুরকি ও চিটাগুড়ের গাঁথুনিতে নির্মিত মসজিদটিতে ১৫ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট ৬টি বড় গম্বুজ ৮ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট ১৪টি মিনার রয়েছে। চার কোণে রয়েছে ২৫ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট ৪টি মিনার।
মসজিদটির পাশে রয়েছে একটি সুগভীর পুকুর। পুকুরের তলদেশ থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে মসজিদ চত্বরে। মসজিদের ভিতরে ৫টি সারিতে ৩২৫ জন ও মসজিদের বাইরের চত্বরে ১৭৫ জন মুসল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটি বাংলাদেশ সরকারের প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছে।
‘মোগল মুমেন্টস অব বাংলাদেশ’ নামক গ্রন্থে বলা হয় তেঁতুলিয়া মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা মৌলভী কাজী সালামতউল্লাহ খান বাহাদুর তেঁতুলিয়ার একজন জমিদার ছিলেন। তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ শাসনামলের ডেপুটি কালেক্টর এবং ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন।
জমিদার কাজী সালামতউল্লাহ ১৮০০ শতকের দিকে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে জনশ্রুতি থাকলেও নির্দিষ্ট সাল নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ১৮১৮, ১৮২৫ কিংবা ১৮৫৮-১৮৫৯ সালে মসজিদটি নির্মাণ করা হয় বলে বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। মসজিদের খুব কাছে ‘সালাম মঞ্জিল’টিও সমসাময়িককালে কাজী সাহেব প্রতিষ্ঠা করেন।
মসজিদটি খুলনা-পাইকগাছা সড়কের কোল ঘেঁষে তালা উপজেলা সদরের ২-৩ কিলোমিটার উত্তরে আঠারো মাইল অভিমুখে আঞ্চলিক সড়কের পাশে এক একর জায়গাজুড়ে অবস্থান করছে। মসজিদের ভিতরে ৫টি সারিতে ৩২৫ জন ও মসজিদের বাইরের চত্বরে ১৭৫ জন নামাজী একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদফতর তাদের আয়ত্তে নিয়েছে।
লন্ডন প্রবাসী মন্টি সিদ্দিকী (কাজী সালামতউল্লাহর বংশধর) দেয়া তথ্য মতে, মসজিদটির সঙ্গে ১৮৪০-৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতার শাহজানী বেগম মসজিদ এবং ১৮৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতার ধর্মতলার টিপু সুলতান মসজিদের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।
বর্তমানে অযত্ন আর অবহেলায় ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটির সৌন্দর্য নষ্ট হতে বসেছে। ৭টি মিনার ভেঙে পড়ার উপক্রম। মসজিদের বাউন্ডারি এলাকায় বহু অজানা ব্যক্তির কবরের চিহ্ন থাকলেও সেগুলো অরক্ষিত। মসজিদটির ফ্লোরে ও পশ্চিম পাশের দেয়ালের ওপরের অংশে ফাটল ধরেছে। যদি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয় তবে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী তেঁতুলিয়া শাহী জামে মসজিদটি কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে বলে সচেতন এলাকাবাসী আশঙ্কা করছেন।