আজ আষাঢ়ের প্রথম দিন

46

এম.এ.সাবলু হৃদয় : আজ আষাঢ়ের প্রথম দিন। তৃষিত হৃদয়ে,পুষ্পে-বৃক্ষে,পত্র-পল্লবে নতুন প্রাণের নতুন গানের সুর নিয়ে বর্ষা সমাগত। গ্রীষ্মের অগ্নিঝরা দিনগুলো যখন প্রকৃতিকে করে বিবর্ণ ও শুষ্ক এবং জনজীবনকে করে অসহনীয়, তখনই বর্ষা রিমঝিম বৃষ্টি ঝরিয়ে প্রকৃতিকে করে তোলে সজীব। বর্ষার মুষলধারার বৃষ্টিতে ভেজার জন্য তাই তৃষিত অপেক্ষাতুর প্রকৃতি উন্মুখ হয়ে আছে। বহু যুগের ওপার থেকে ভেসে আসা স্মৃতি-সৌরভ। যেন গান হয়ে ভেসে ওঠে বাদল দিনের প্রথম কদমফুল। বড় বড় সবুজ পাতার ফাঁকে একেকটি কদমফুল ঝুলে থাকে। আমরা যে গোল আকারের কদম ফুল দেখি সেটি কিন্তু একটিমাত্র ফুল নয়। অজস্র ফুলের সমারোহ। এর ভেতরের মাংসলপিণ্ড থেকে হলুদ রঙের নলাকৃতির হাজার হাজার ফুল বেরিয়ে এসে বলটাকে স্পঞ্জ বানিয়ে রাখে। ওপরের সাদার প্রলেপগুলো অজস্র ফুলের পরাগকেশ। হাজার ফুলের সমন্বয়ে এটি একটি ফুল। কদমফুলের ঘ্রাণ তীব্র নয়। তবে চার পাশ মদির করে রাখতে পারে। বড় নষ্টলজিক সেই ঘ্রাণ। যে কাউকেই মোহময় করে তুলতে পারে। কদমফুলকে বলা হয় বর্ষার দূত। এর কারণ, কদমফুল মূলত বর্ষার ফুল হলেও ফোটা শুরু করে জ্যৈষ্ঠের শেষ দিক থেকেই। কদম ছাড়া আমাদের বর্ষা বেমানান। অসম্পূর্ণ। আষাঢ় মাসেই এ ফুলের সমারোহ হয় বেশি। কদমফুলের নজরকাড়া সৌন্দর্য এবং এর সৌরভ যুগে যুগে বাঙালিকে মুগ্ধ করেছে। এই ফুল পথিককে উদাস করে। গ্রাম্য বালিকাকে চঞ্চল করে তোলে।
এ কদমফুল নারী প্রেম কতটা তীব্র হতে পারে বাংলা সাহিত্যে তার বহু নিদর্শন রয়েছে। প্রসঙ্গত, প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেনÑ যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো,/ চলে এসো এক বরষায়…/
যদিও তখন আকাশ থাকবে বৈরী/ কদমগুচ্ছ হাতে নিয়ে আমি তৈরি/
…কদমগুচ্ছ খোঁপায় জড়ায়ে দিয়ে/ জলভরা মাঠে নাচিব তোমায় নিয়ে/
তুমি চলে এসো, চলে এসো এক বরষায়… ইত্যাদি।
বাংলায় আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস বর্ষা ঋতু। তাই চারপাশের পরিবেশ বদলে যায়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় ‘আবার এসেছে আষাঢ়, আকাশ ছেয়ে, আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে।’ অথবা ‘ঐ আসে ঐ ঘন গৌরবে নব যৌবন বরষা, শ্যাম গম্ভীর সরসা।’ বর্ষায় প্রকৃতির এমন পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল লিখেছেন রিম ঝিম রিম ঝিম ঝিম ঘন দেয়া বরষে।/কাজরি নাচিয়া চল, পুর-নারী হরষে/ কদম তমাল ডালে দোলনা দোলে/কুহু পাপিয়া ময়ূর বোলে,/মনের বনের মুকুল খোলে/নট-শ্যাম সুন্দর মেঘ পরশে…।
মহাকবি কালীদাস তার ‘মেঘদূত’ কাব্যে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বিরহকাতর ‘যক্ষ মেঘ’কে দূত করে কৈলাসে পাঠিয়েছিলেন তার প্রিয়ার কাছে। যক্ষের সেই বিরহ বারতা মেঘদূত যেন সঞ্চারিত করে চলেছে প্রতিটি বিরহকাতর চিত্তে, যুগ থেকে যুগান্তরে। তাই রবীন্দ্রনাথ কালীদাসের উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘কবির কবে কোন আষাঢ়ের পুণ্য দিবসে লিখেছিলে মেঘদূত। বৃষ্টির শব্দে যক্ষের মতোই বাঙালির হৃদয় এক অজানা বিরহে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। কেতকীর মন মাতানো সুগন্ধ আর কদম ফুলের চোখ জুড়ানো শোভা অনুষঙ্গ হয়ে আছে আষাঢ়ের। কদম কেতকী ফুটবে, আকাশজুড়ে চলবে মেঘের আনাগোনা, দ্রিমিকি দ্রিমিকি রবে।’ এমন দিনে ‘মুহূর্তে আকাশ ঘিরি রচিল সজল মেঘস্তরদ আর তাতে রিক্ত যত নদীপথ’ ভরে যাবে ‘অমৃতপ্রবাহে’। মরুবক্ষে তৃণরাজি/পেতে দিল আজি/শ্যাম আস্তরণ। গুরুগুরু মেঘ গর্জে ভরিয়া উঠিল বিশ্বময়। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ আষাঢ়কে বলেছেন, ‘ধ্যানমগ্ন বাউল-সুখের বাঁশি’। আষাঢ়ে জলভারানত ঘনকৃষ্ণ মেঘরাশি আকাশ ছেয়ে রাখে। কখনো বা ‘প্রাণনাথ’-এর মতো প্রকৃতিতে নামে বারিধারা।