সাদা মেঘ

66
শেখ মোঃ মামুন হোসেন : ছোট্ট একটা রান্না ঘর।ভিতরটা দেখা যাচ্ছিল রাস্তা থেকেই।এলাকায় লোক সমাগম কম।গাড়ি থেকে নামলাম।ঘরটি থেকে ধোয়া উড়ছিল তার লক্ষ্য পথে।ভেতরে কেউ একজন আছে বলে মনে হলো।শুধু তার চোখ আর কাপড়ে ঢাকা মাথা দেখা যাচ্ছে।রান্না ঘরটির পাশেই থাকার ঘর।গাড়ির শব্দ শুনে ঘরটি থেকে ছোট্ট একটা ছেলে দৌড়ে রাস্তায় এসে দাড়ালো।রান্না ঘর থেকে আওয়াজ আসছিল….
মন্টু কোনে যাস বাবা,রাস্তায় যাইসনে গাড়ির নিচে পরবি বাপ এদিক আয়।তোর বাপ আসলে কয়ে দিবো,তোমার ছাওয়াল আমার কতা শোনে না,আয় বাপ আমার কাছে আয় দেখ তোর জন্যি কী নানতেছি।
তবুও ছেলেটি ফিরছে না।গাড়ির একটু ফাকে কোমরে দুহাত দিয়ে  দাড়িয়ে আছে।মায়ের মুখের কথা যেন তার কান অব্দি পৌছায়নি।একবার গাড়ি দেখছে আবার আমাদেরকে দেখছে।গাড়ির উপড়ে লাল-নীল বাতি জলছে আর আমাদের সমস্ত শরীর ঢাকা।মন্টু না ফেরাতে মন্টুর মা বলতে শুরু করলো….
ওমন্টু আয় বাপ আমার কাছে।তোমার নানা খাজা আনছে নিয়ি যাও।
মন্টু একটুও নড়চড় করছে না।মন্টুর মা ছেলের পাত্তা না পেয়ে দৌড়ে এসে মন্টুকে কোলে নিয়ে গালে মুখে চুমু দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।মন্টু তার কোনো কথাই না শুনে কান্নাকাটি করছে।
মন্টুর কান্না আর ওর মায়ের ভালোবাসা দেখে নিজেদের চোখকে ধরে রাখতে পারলাম না।নিরাপত্তার জন্য সমস্ত শরীর ঢাকা থাকলেও মনটা যে বাধা নেই।চোখে দামি দামি গ্লাচ পড়ে থেকেও চোখকে বেধে রাখতে পারলাম না।বন্ধ করলে পারলাম না চক্ষু নদীর ঢেউহীন স্রোত।গড়িয়ে পরলো দুফোটা লোনা পানি।তখনই যেন জ্ঞান ফিরল আমার।জিজ্ঞাস করছি….
এটা কি মাসুদ সাহেবের বাড়ি?
হ‍্যা।কেন?
হ‍্যা বলার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির পেছন দরজা খুলে দিলো।নামাতে শুরু করল ছয় ফুট লম্বা  একটি বক্স।দেড় ফুট প‍্রস্থ।
আপনি কি উনার স্ত্রী।হ‍্যা,আপনেরা কারা,উনার কতা শুতিচেন কি ওয়ছে ওর?
বক্সটি মাটিতে নামিয়ে চারপাশে সীমানা করে দেওয়া হলো।কয়েকজন এলাকাবাসী আসলো।সীমানার সাথে দাড়ালো সবাই তিন ফুট ফাকা রেখে,মুখে কাপড় দিয়ে আছে।বক্সটি খুলে দিয়ে ভেতরের মানুষটাকে দেখানোর জন্য মুখ সাদা কাপড় সরিয়ে দিলাম।এলাকাবাসী দেখেই দুরে গিয়ে কানা ঘোষা করে চলে গেল আর মেয়েটি মন্টুকে ছেড়ে স্বামীর জন্য যেন পাগল হয়ে গেল।বারবার স্বামীর কাছে যেতে চাইছে।কয়েক জন মহিলা এসে মন্টুর মাকে ফাকে নিয়ে গেল।থামছে না তার কন্দন আর আহাজারি।
মন্টু মায়ের দিকে থমকে চেয়ে আছে।গ‍্রামের মাতব্বর খবর পাঠিয়েছেন মাসুদকে এখানে দাফন করতে দেওয়া হবেনা সে করোনায় আক্রান্ত।
মাসুদে নিথর দেহ গাড়িতে উঠাচ্ছি।তখন যেন আকাশ ভেঙে পড়লো মন্টুর মায়ের মাথায়।হাজারো মন কেড়ে নেওয়া কথা।তার কান্না জড়িত কন্ঠের কথায় বুঝি পাথর ফেটে তুলায় পরিণত হচ্ছে,আকাশ জমিনে নেমে আসবে, আগ্নেয়গিরি অগ্নুৎপাতের লাভা শিতল হয়ে যাচ্ছে তবুও মাতব্বরের সিদ্ধান্ত থেকে নড়াতে পারলো না।আমাদের যেতে দেরি হচ্ছে দেখে মাতব্বর নিজেই আসলেন।
মন্টুর মা তার পা জড়িয়ে ধরে কান্না করছে আর বলছে…
ওনারে এখানেই মাটি দিবির কন চাচা।চাচা আমি আপনের মিয়ির মতো ইটু দয়া করেন চাচা।সারাজীবন আপনের চাকরাণী হয়ে থাকবো তাও ওনারে এই গায়েই মাটি দিবির কন।
মাতব্বর সাহেব ফাকে দাড়িয়ে বলল…
ওর লাশ নিয়ে আপনারা দুরুতো এখান থেকে চলে যান।
চাচা গোরস্তানে না চাচা ওনার বাড়িতেই মাটি দিবির কন।তাও ওনারে গাও ছাড়া কইরেন না।
আপনারা এখনো যাচ্ছেন না কেন?ওরে এখানে দাফন করা হবেনা।
আমরা গাড়িতে চড়ে বসলাম।মন্টুর মা জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।চার বছরের মন্টু গাড়ির দিকেই চেয়ে আছে।বেরিয়ে আসলাম এলাকা থেকে।তাকে সরকারী গোরস্থানে দাফন করলাম।
কয়েকদিন পর…..
মাতব্ব ঘরে শুয়ে আছে।হঠাৎ কেউ একজন আতঙ্ক সুরে ডেকে উঠলো…
মাতব্বর চাচা সর্বনাশ হয়ে গেছে শঙ্কর ভাই।
মাতব্বর ছেলের নাম শুনে দৌড়ে ঘর থেকে বাইরে আসলো….
শঙ্করের কি হয়েছে এমন করছিস কেন তুই?
খবর পেলাম শঙ্কর ভাই আর দুনিয়াতে নেই।করোনা আক্রান্ত হয়ে কাল রাতে মারা গেছে।
ছেলের মৃত‍্যুর সংবাদ শুনে…
মাতব্বর অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।মাথায় পানি ঢেলে তাকে সুস্থ করলো।সস্থ হয়েই…
বারবার ছেলের কথা জিজ্ঞেস করছে।শঙ্কর সৌদি আরবে থাকে।বাবা মায়ের একটাই সন্তান।তিন বছর হয়েছে প্রবাস জীবন।এবার বাড়ি ফিরে বিয়ে করবে বলেছে।মাতব্বর বারবার বলছে….
বাপরে টাকার জন্য তোমারে হারালাম।কেউ আমার বাজানে লাশটাকে দেশে এনে দাও।আমার সমস্ত কিছু লিখে নাও তবুও আমার ছেলেকে এনে দাও।আমার ছেলেক এলাকাতেই দাফন করতে চাই।তোমরা আমার ছেলেকে এনে দাও।আমি কিছুই চাই না।
চাচা শুনেছি….
ভাইকে গণ কবর দেওয়া হয়েছে।কেউ বলতে পারছে না কোথায় কবর দেওয়া হয়েছে।চাইলেও আমরা যে ভাইকে আনতে পারবো না।চাচা ধৈর্য্য ধরেন আর নামাজ পড়ে ভাইয়ের জন্য দোয়া করেন।ভাই যেন জান্নাতী হয়।
মন্টুর মায়ের সংসার কোনো রকম চলছে।সাত রাজার ধন মানিকে বুকে নিয়ে।বাড়িতে কোনো সাড়া শব্দ নেই।মাঝে মধ‍্যে শুধু মন্টুর মা ডাকতে শোনা যায়।ছোট্ট মন্টু না বুঝে কানে কানে হাত দিয়ে আব্বু বলতে বলতে বাড়ি থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসে।সে তো জানে না তার আব্বু বেচে নেই।
জৈষ্ঠ্য মাসের বিকেল বেলায় মন্টু  বাড়ি থেকে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে রাস্তায় এসে দাড়ালো।মন্টুর মা দেখছে কিন্তু তার চোখের পলক পড়ছে না। গুড়গুড়ি বৃষ্টি পরছে।আকাশে তেমন মেঘ নেই।একটুকরা সাদা মেঘ ভেসে মন্টুর মাথার উপরে আসলো।মন্টুর মা বারান্দা থেকে দৌড়ে ছেলেকে ধরতে আসছে।হঠাৎ প্রচন্ড শব্দে মেঘ গর্জে উঠলো।তখনই মন্টুর মা দেখতে পেল আকাশ থেকে আগুন এসে মন্টুর গায়ে পরলো।চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
বাবা মন্টু রে…।